২০ লক্ষ টাকার লোভনীয় চাকরি ছেড়ে রাতারাতি আইপিএস! ১২ কিমি হেঁটে স্কুল যাওয়া এই তরুণের জীবনযুদ্ধ সিনেমার হার মানাবে।

২০ লক্ষ টাকার চাকরি ছেড়ে আইপিএস! অভাবের সঙ্গে লড়াই করে সাফল্যের ইতিহাস গড়া শরণ কাম্বলের অদম্য জীবনযুদ্ধ

সকালে ঘুম থেকে উঠে হয়তো অনেকেই আজকের দিনটা কেমন কাটবে তা নিয়ে ভাবেন। কিন্তু একসময় মহারাষ্ট্রের সোলাপুর জেলার তাডওয়ালে গ্রামের এক তরুণকে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবতে হতো স্কুলে পৌঁছানোর সেই ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ নিয়ে। বাড়িতে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। বাবা-মা দুজনেই কায়িক শ্রমের পাশাপাশি সংসার চালাতে সবজি বিক্রি করতেন। নিত্যদিনের অভাব ছিল যার নিত্যসঙ্গী। অথচ সেই সাধারণ পরিবারের ছেলেই সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজ দেশের অন্যতম সফল আইপিএস (IPS) অফিসার। শরণ কাম্বলের এই গল্প শুধু একটি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সাফল্যের গল্প নয়, এটি এক অদম্য জেদ ও আত্মবিশ্বাসের রূপকথা।

অভাবের সংসারেও পড়াশোনায় অনড় মনোভাব ১৯৯৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জন্ম শরণের। বাবা গোপীনাথ কাম্বলের স্বপ্ন ছিল, ছেলে একদিন বড় অফিসার হয়ে সমাজের মুখ উজ্জ্বল করবে। পরিবারের চরম আর্থিক অনটন সত্ত্বেও শরণের পড়াশোনায় যাতে কোনো ছেদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করেছিলেন তাঁর বাবা-মা। গ্রামের সরকারি স্কুল থেকে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করার পর যখন তিনি একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে ওঠেন, তখন থেকেই শুরু হয় আসল লড়াই। প্রতিদিন বাড়ি থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ হেঁটে তাঁকে ক্লাসে যাতায়াত করতে হতো। যাতায়াতের এই চরম কষ্ট তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি, বরং সেই দীর্ঘ পথই তাঁকে মানসিকভাবে আরও অনেক বেশি শক্ত করে তুলেছিল।

২০ লক্ষ টাকার চাকরি ছেড়ে কঠিন পথে পদার্পণ স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে অভাবের মধ্যেই ওয়ালিয়াট কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে বিটেক (BTech) সম্পন্ন করেন শরণ। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য সুযোগ পান আইআইএসসি ব্যাঙ্গালোরে (IISc Bangalore)। পড়াশোনা শেষ করার পর তাঁর সামনে আসে এক সোনালী সুযোগ। একটি নামী মাল্টিন্যাশনাল সংস্থা তাঁকে বার্ষিক ২০ লক্ষ টাকার বেতনে চাকরির অফার দেয়।

যে পরিবারে দুবেলা দুমুঠো ভাতের জোগাড় করাই কঠিন ছিল, সেই পরিবারের তরুণের সামনে তখন এক নিশ্চিত ও স্বচ্ছল ভবিষ্যৎ। চাইলে তিনি সেই চাকরি নিয়ে জীবন গুছিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু বাবার স্বপ্ন এবং নিজের অদম্য জেদের কাছে সেই ২০ লক্ষ টাকার চাকরি ফিকে হয়ে যায়। সমস্ত নিরাপত্তা ত্যাগ করে তিনি UPSC-এর মতো দেশের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং পাড়ি দেন দিল্লিতে।

দিল্লির মাটিতে নতুন লড়াই এবং স্কলারশিপের আলো দিল্লিতে গিয়ে শুরু হয় নতুন কষ্টের অধ্যায়। থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে প্রতিদিনের প্রাথমিক প্রয়োজন মেটানোই তখন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। টাকার অভাবে বারবার থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল তাঁর প্রস্তুতি। ঠিক সেই সংকটজনক মুহূর্তে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় মহারাষ্ট্র সরকারের একটি স্কলারশিপ। সেখান থেকে প্রতি মাসে ১২,০০০ টাকা করে আট মাসের আর্থিক সহায়তা পান শরণ। সেই টাকাই হয়ে ওঠে তাঁর ঘুরে দাঁড়ানোর মূল হাতিয়ার এবং ইউপিএসসি (UPSC) প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় ভরসা।

সাফল্যের মুকুট এবং একের পর এক মাইলফলক কঠোর পরিশ্রম আর নাছোড়বান্দা মানসিকতার ফল হাতেনাতে মিলতে শুরু করে:

  • ২০১৯ সাল: UPSC CAPF পরীক্ষায় সারা দেশে অল ইন্ডিয়া র‍্যাঙ্ক (AIR) ৮ অধিকার করেন শরণ।

  • ২০২০ সাল: UPSC সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় AIR 542 অধিকার করে সরাসরি ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস বা IPS-এ যোগ দেওয়ার সুযোগ পান।

  • ২০২১ সাল: নিজের র‍্যাঙ্ক আরও উন্নত করতে ফের পরীক্ষায় বসে AIR 127 অর্জন করেন এবং IFS (Indian Foreign Service)-এর জন্যও যোগ্যতা অর্জন করেন।

তবে শেষ পর্যন্ত তিনি আইপিএস (IPS)-কেই বেছে নেন। কারণ ছোটবেলা থেকে যে স্বপ্ন তাঁকে এত দূর টেনে এনেছিল, তা ছিল পুলিশ সার্ভিসে যোগ দিয়ে সরাসরি দেশের সাধারণ মানুষের সেবা করা।

১২ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া সেই কিশোর আজ দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চেয়ারে আসীন। শরণ কাম্বলের জীবন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—জীবনের শুরুটা কতটা কঠিন বা অভাবের ছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়; শেষ পর্যন্ত আপনি কতটা লড়াই করে নিজের লক্ষ্য অর্জন করলেন, সেটাই আসল জয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *