মহাভারত বা রামায়ণ নয়, ওনামের আসল ইতিহাস কী? রাজা মহাবলির পৌরাণিক কাহিনীর নেপথ্যের সত্যিটা জানলে চমকে যাবেন!

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওনাম কেরলে কেবল একটি উৎসব হিসেবে আসেনি, বরং তা যেন এক ঘরে ফেরার আনন্দ নিয়ে হাজির হয়। বাড়ির উঠোন রঙবেরঙের ফুল দিয়ে সাজানো পূক্কালম (pookkalam), কলাপাতা জুড়ে এলাহি ওনাসাদ্যার (Onasadya) আয়োজন, ব্যাকওয়াটারে সাপের মতো ছুটে চলা নৌকার বাইচ—সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক রাজার গল্প, যাঁর প্রতি তাঁর প্রজাদের ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে, নির্বাসনও তাঁকে চিরতরে কেড়ে নিতে পারেনি। ২০২৬ সালের ২৬শে আগস্ট কেরল যখন তিরুভোনম (Thiruvonam) উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ওনামের ইতিহাস যেন পৌরাণিক বিশ্বাস, কৃষি ঐতিহ্য, মন্দির সংস্কৃতি এবং শতবর্ষের সামাজিক স্মৃতির এক অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় সংমিশ্রণ হয়ে উঠেছে।
মহাবলির লিজেন্ড: ওনামের কেন্দ্রবিন্দুতে যা রয়েছে
ওনামের সঙ্গে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে ঐতিহ্যটি জড়িয়ে রয়েছে, তা হলো রাজা মহাবলি বা মাভেলি। লোককথা অনুযায়ী, তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু এবং ন্যায়পরায়ণ এক অসুর রাজা। তাঁর রাজত্বে প্রজার সুখ-সমৃদ্ধি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, দেবতারা তাঁর ক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এরপর ভগবান বিষ্ণু বামন অর্থাৎ এক খর্বাকৃতি ব্রাহ্মণের রূপ ধারণ করে মহাবলির কাছে আসেন এবং তিন পদ পরিমাণ জমি ভিক্ষা চান। মহাবলি রাজি হলে বিষ্ণু নিজের রূপ প্রসারিত করে দুই পদেই পৃথিবী ও স্বর্গ দখল করে নেন। তৃতীয় পদক্ষেপের জন্য জায়গা না থাকায় মহাবলি নিজের মাথা পেতে দেন। বিষ্ণু তাঁকে পাতাললগ্নে পাঠিয়ে দিলেও তাঁর ভক্তি ও উদারতায় মুগ্ধ হয়ে বছরে একবার প্রজার টানে ফিরে আসার বর দেন। আর সেই প্রত্যাবর্তনকেই তিরুভোনম হিসেবে পালন করা হয়।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, পৌরাণিক উপকথার সঙ্গে প্রকৃত ইতিহাসের ফারাক রয়েছে। এমন কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই যে, বর্তমান কেরল অঞ্চলে ‘মহাবলি’ নামে কোনো রাজা আক্ষরিক অর্থেই রাজত্ব করতেন। গবেষকদের মতে, মহাবলির এই গল্পটি ধীরে ধীরে প্রাচীন কোনো উৎসবের সঙ্গে মিশে গিয়ে আজকের এই সাংস্কৃতিক রূপ নিয়েছে।
কত প্রাচীন ওনাম?
ওনামের উৎপত্তি কেবল মহাবলির গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। কেরল ট্যুরিজমের তথ্য অনুযায়ী, সঙ্গম যুগের তামিল সাহিত্যেও ওনামের উল্লেখ পাওয়া যায়, যার মধ্যে রয়েছে ‘মধুরাই কাঞ্জি’-র মতো প্রাচীন গ্রন্থ। ইতিহাসবিদদের মতে, আধুনিক কেরলের আত্মপ্রকাশের বহু আগেই দক্ষিণ ভারতে এই উৎসব বা তার সমতুল্য কোনো উদযাপনের প্রচলন ছিল।
পরবর্তীকালে মধ্যযুগের প্রামাণ্য দলিলেও এর জোরালো প্রমাণ মেলে। আনুমানিক ৮৬১ খ্রিস্টাব্দের একটি তাম্রলিপিতে চেরাপেরুমাল শাসক স্থানু রবির আমলের আভানি ওনাম ভোজের আয়োজনের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মন্দিরের পুরনো নথিপত্র থেকেও প্রমাণিত হয় যে, শত শত বছর ধরে ওনাম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও মন্দিরকেন্দ্রিক উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
আধুনিক ওনামের ইতিহাস মূলত স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের। কেরল ট্যুরিজমের তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী পট্টম থানু পিল্লাইয়ের আমলে ১৯৬১ সালে ওনামকে আনুষ্ঠানিকভাবে কেরলের ‘জাতীয় উৎসব’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে পর্যটন দফতরের উদ্যোগে এই উৎসবের পরিধি আরও বৃদ্ধি পায় এবং তা আজকের এই বিশাল রূপ নেয়।
আজ ওনাম মানেই অ্যাথাসামায়াম (Athachamayam), সাপের নৌকার বাইচ (Vallamkali), পুলিকালি, কাইকোট্টিকালি এবং ঐতিহ্যবাহী ওনাসাদ্যা। ওনামের আসল সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট পৌরাণিক কাহিনীর মধ্যে আবদ্ধ নয়; বরং এটি কৃষি উৎসবের প্রাচুর্য, মহাবলির স্মৃতির রোমন্থন এবং আধুনিক কেরলের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের এক নিখুঁত প্রতীক।