“বেতন দিলেই কি কেনা গোলাম ভাববেন?” উচ্চবিত্ত মালকিন কীভাবে পরিচারিকাকে টর্চার করতেন দেখুন সেই শিউরে ওঠার দৃশ্য

ভারতের অন্যতম হাই-প্রোফাইল এবং অভিজাত আবাসন হিসেবে পরিচিত গুরুগ্রামের ‘ডিএলএফ ক্যামেলিয়াস’ (DLF Camellias)। সেই বিলাসবহুল আবাসনের অন্দরেই ঘটে যাওয়া এক পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। সামান্য কাজের অজুহাতে এক গৃহপরিচারিকার ওপর যেভাবে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা আধুনিক সমাজের তথাকথিত উচ্চবিত্ত শ্রেণির একাংশের সামন্ততান্ত্রিক ও দাস মানসিকতার কদর্য রূপটিকেই ফের একবার চরমভাবে উন্মোচিত করেছে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিও এবং রোমহর্ষক বিবরণ
সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া প্রায় দেড় মিনিটের ওই সিসিটিভি বা গোপন ক্যামেরার ফুটেজে যা দেখা গেছে, তা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষকে শিউরে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। অভিযুক্ত ৫২ বছর বয়সী মহিলা রুচিরা সচদেভা তাঁর পরিচারিকাকে কিচেন বা রান্নাঘর থেকে বের হতে দেখেই হঠাৎ হিংস্রভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি পিছন থেকে পরিচারিকার লম্বা চুল ধরে সজোরে টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে আসেন।

এরপরেই শুরু হয় চরম অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং শারীরিক নিগ্রহ। শুধু হাতাহাতি বা চড়-থাপ্পড়ই নয়, অভিযুক্ত মালকিনকে নিজের মোবাইল ফোন দিয়ে ওই অসহায় পরিচারিকার গায়ে ও মাথায় আঘাত করতে এবং নানাবিধ ভয়ংকর হুমকি দিতে দেখা যায়। সৌভাগ্যবশত, কমপ্লেক্সের অপর একটি ফ্ল্যাটের এক প্রতিবেশী এই সম্পূর্ণ পৈশাচিক দৃশ্যটি গোপনে নিজের ক্যামেরায় ভিডিওবন্দি না করলে হয়তো এই গোপন অপরাধের কথা চিরতরে অন্ধকারেই থেকে যেত।

ঘটনার পিছনের টাইমলাইন এবং পুলিশের স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ
পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২৪ জুলাই। পরবর্তীতে ভিডিওটি যখন নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয়, তখন সুশান্ত লোক থানার পুলিশ আর কালক্ষেপণ না করে বিষয়টি নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (Suo Motu) তদন্তে নামে। অভিযুক্ত মহিলা রুচিরা সচদেভার বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) প্রাসঙ্গিক ১১৫ নম্বর ধারায় এফআইআর রুজু করে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পরবর্তীতে তিনি তদন্তে সবরকম সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় আইনি প্রক্রিয়ার মারপ্যাচে তাঁকে জামিন দেওয়া হয়।

তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিকরা আরও জানতে পেরেছেন যে, নির্যাতিতা পরিচারিকা মূলত প্রতিবেশী দেশ নেপালের বাসিন্দা এবং গত প্রায় দু’বছর ধরে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গেই ওই বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন। এই পাশবিক ঘটনার ঠিক কয়েকদিন পর, অর্থাৎ গত ২৭ জুলাই কাজের জায়গায় কথা কাটাকাটির জেরে তিনি পাকাপাকিভাবে ওই কাজ ছেড়ে দেন এবং নিজের দেশ নেপালে ফিরে যান। পুলিশের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয় যে, পরিচারিকা বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সরাসরি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। উলটো সোশ্যাল মিডিয়া থেকে যাতে এই মর্মান্তিক ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করা হয়, সেই সংক্রান্ত একটি অনুরোধও করা হয়েছিল। তবে পুলিশ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, অপরাধের তীব্রতা, সত্যতা ও সামাজিক গুরুত্ব বিচার করে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে তারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত চালিয়ে যাবে।

এই ঘটনাটি আমাদের সমাজ ব্যবস্থার সামনে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে। কাউকে নির্দিষ্ট মাসিক পারিশ্রমিক বা মাইনে দিয়ে গৃহকর্মে বহাল করা মানেই তাঁকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ক্রীতদাস বানিয়ে ফেলা নয়। একজন মানুষের শ্রমের বিনিময় দেওয়া হয়, তাঁর আত্মসম্মান বা জীবনের ওপর মালিকানা কেনা হয় না। গৃহকর্মীরা কোনোমতেই ক্রীতদাস নন। সমাজ ও আইনের কঠোর বার্তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি যে, তথাকথিত অভিজাত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির এই ধরনের সামন্ততান্ত্রিক অহংকার এবং অমানবিক আচরণ কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া হবে না এবং এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *