প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় বড় সংযোজন! তীব্র তাপপ্রবাহ ও বজ্রপাতকে অফিশিয়ালি ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা কেন্দ্রের

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলতে এতদিন মূলত বন্যা, সাইক্লোন বা ভূমিকম্পের মতো বিপর্যয়গুলিকেই বোঝানো হতো। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে দেশজুড়ে লাগাতার বাড়তে থাকা চরম আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে এবার এক ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র সরকার। তীব্র তাপপ্রবাহ (‘Heat Wave’) এবং বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ (Natural Disaster) হিসেবে ঘোষণা করা হলো।
এই বড় সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে রাজ্য সরকারগুলি ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৫ (Disaster Management Act, 2005)-এর নির্দিষ্ট বিধানের অধীনে ত্রাণ ও উদ্ধার কাজের জন্য সরাসরি কেন্দ্রীয় আর্থিক সহায়তা লাভ করবে।
১. কেন এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্র?
জলবায়ু পরিবর্তন ও লাগাতার গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতে তাপপ্রবাহ ও বজ্রপাতের প্রকোপ মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে দেশজুড়ে হিটস্ট্রোকে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৫,০০০ মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু মহারাষ্ট্রেই প্রাণ হারিয়েছেন ১১ জন।
পাশাপাশি, বজ্রপাতে প্রতি বছর দেশে প্রায় ২,০০০ থেকে ২,২৫০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, যার প্রায় ৯৬ শতাংশই ঘটে গ্রামীণ এলাকায়। বিভিন্ন রাজ্য সরকার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই কেন্দ্র অবশেষে এই প্রাণঘাতী আবহাওয়া সংক্রান্ত ঘটনাগুলিকে জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করল।
২. নিয়ম বদলালো যেভাবে: আগে বনাম এখন
-
আগের নিয়ম: এতদিন পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের অধীনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কেন্দ্রীয় তালিকায় তাপপ্রবাহ অন্তর্ভুক্ত ছিল না (তালিকায় তখন ১২টি বিভাগ ছিল)। পঞ্চদশ অর্থ কমিশন তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পক্ষে পর্যাপ্ত কারণ দেখায়নি। ফলস্বরূপ, রাজ্যগুলিকে নিজেদের সীমিত তহবিল থেকেই এর মোকাবিলা করতে হতো এবং এসডিআরএফ (SDRF)-এর বার্ষিক বরাদ্দের সর্বোচ্চ ১০% অর্থ এর জন্য খরচ করার কড়া সীমাবদ্ধতা ছিল।
-
বর্তমান পরিবর্তন: নতুন এই কেন্দ্রীয় বিজ্ঞপ্তির ফলে রাজ্য সরকারগুলি এখন রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা ও প্রশমন তহবিল (SDRF) আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে পারবে। কোনো বড় সঙ্কটের সময় রাজ্যের তহবিল অপর্যাপ্ত হলে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল (NDRF) থেকেও সরাসরি আর্থিক সাহায্য নেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে ত্রাণ বিতরণ, ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং প্রতিরোধমূলক প্রকল্পগুলিতে অর্থের কোনো অভাব হবে না।
৩. সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলি কোনগুলি?
-
তাপপ্রবাহের কবলে: রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা এবং উত্তর কর্নাটক। এই রাজ্যগুলিতে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায়শই ৪৫ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি ছুঁয়ে ফেলে।
-
বজ্রপাতের কবলে: ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গ। বিশেষ করে পূর্ব ভারত ও ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে কালবৈশাখী ও বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়।
কেন্দ্রের এই নতুন নিয়মের ফলে এখন থেকে তাপপ্রবাহ এবং বজ্রপাতের মতো প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলির মোকাবিলায় রাজ্য প্রশাসনগুলি আরও দ্রুত, সুনির্দিষ্ট এবং শক্তপোক্ত পদক্ষেপ নিতে পারবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।