লালকেল্লায় তেরঙ্গা উত্তোলনের বিখ্যাত ছবি কি ১৫ অগাস্টের নয়? স্বাধীনতা দিবসের ১০টি অজানা রহস্য জানলে চমকে উঠবেন!

১৫ অগাস্ট—এই দিনটি এলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে দিল্লির লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং বর্ণাঢ্য উদযাপনের ছবি। কিন্তু আপনি কি জানেন, আসল ইতিহাসটি এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং চমকপ্রদ? পাঠ্যবইয়ের বাইরে এমন কিছু ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে, যা শুনলে অবাক হতে হয়। প্রায় আট দশক পরেও স্বাধীনতার সেই দিনটি ঘিরে রয়েছে বেশ কিছু অজানা রহস্য।
১. ১৯৪৮ সালে হওয়ার কথা ছিল ভারতের স্বাধীনতা
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট ভারতের স্বাধীনতার আসল তারিখ ছিল না। ব্রিটিশদের পূর্ববর্তী পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিল ১৯৪৩০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় লর্ড মাউন্টব্যাটেন সেই তারিখ এগিয়ে নিয়ে আসেন।
২. ১৫ অগাস্ট বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল জাপানের যোগ!
লর্ড মাউন্টব্যাটেন ব্যক্তিগতভাবে ১৫ অগাস্ট তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জানান, ১৯৪৫ সালের এই দিনেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেছিল জাপান। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিত্রবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনার কারণে এই দিনটির সঙ্গে মাউন্টব্যাটেনের বিশেষ আবেগ জড়িয়ে ছিল।
৩. লালকেল্লায় নেহরুর পতাকা উত্তোলন হয়েছিল ১৬ অগাস্ট!
সবচেয়ে বড় মিথ-বাস্টার হলো ১৫ অগাস্ট ১৯৪৭ সালের সেই বিখ্যাত ছবি ও ঘটনা। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো এবং নেহরু আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, জওহরলাল নেহরু লালকেল্লায় প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন ১৯৪৬ সালের ১৬ অগাস্ট! তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ ‘The Honour of the Flag’-ও ১৬ অগাস্টেরই নথিভুক্ত।
৪. প্রথম তেরঙ্গা উত্তোলিত হয়েছিল চেন্নাইয়ে, সকাল সাড়ে পাঁচটায়!
চেন্নাইয়ের (তৎকালীন মাদ্রাজ) ফোর্ট সেন্ট জর্জ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রেশমের তৈরি ১২ বাই ৮ ফুটের বিশাল তেরঙ্গাটি ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট সকাল ৫:৩০ মিনিটে প্রথম উত্তোলিত হওয়া পতাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
৫. দিল্লিতে উৎসবের দিনে অনশন ও প্রার্থনা করছিলেন গান্ধীজি
যখন গোটা দেশ স্বাধীনতায় উল্লাসে মেতেছে, মহাত্মা গান্ধী তখন দিল্লিতে কোনো উৎসবে যোগ দেননি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে তিনি সেই দিনটি কলকাতায় কাটিয়েছিলেন এবং সারাদিন উপবাস ও প্রার্থনা করে সময় কাটিয়েছিলেন।
৬. ১৫ অগাস্ট মানেই কি প্রজাতন্ত্র?
১৫ অগাস্ট ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও এটি তাৎক্ষণিকভাবে ‘প্রজাতন্ত্র’ হয়ে ওঠেনি। ভারতীয় স্বাধীনতা আইন, ১৯৪৭ অনুযায়ী ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন ‘ডোমেনিয়ন’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরই ভারত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
৭. স্বাধীনতার ঠিক ২৪ দিন আগে গৃহীত হয় তেরঙ্গা
বর্তমান রূপের জাতীয় পতাকাটি গণপরিষদ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই—স্বাধীনতার ঠিক ২৪ দিন আগে। তার আগে চরকা চিহ্নিত পতাকাকে জাতীয় পতাকার রূপ দেওয়া হয়েছিল।
৮. ২৬ জানুয়ারিই ছিল আসল ‘পূর্ণ স্বরাজ’ দিবস
১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি কংগ্রেস ঐতিহাসিক ‘পূর্ণ স্বরাজ’ দিবস হিসেবে পালন করেছিল। সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় রাখতেই পরবর্তীকালে ২৬ জানুয়ারি তারিখটিকে সংবিধান কার্যকর করার জন্য বেছে নেওয়া হয়, যা আজ প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়।
৯. স্বাধীনতার দিনে জাতীয় সংগীত ছিল না ‘জন গণ মন’
১৯৪৭ সালের অগাস্টে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘জন গণ মন’ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদ একে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে।
১০. ভারত ও পাকিস্তান উভয়েরই আইনি দিন ছিল ১৫ অগাস্ট
১৯৪৭১ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী ১৫ অগাস্টকেই ভারত ও পাকিস্তানের জন্য ‘নির্ধারিত দিন’ (Appointed Day) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে করাচিতে ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠানের সময়ের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান ১৪ অগাস্ট তাদের স্বাধীনতা দিবস পালন শুরু করে।
ইতিহাসের এই অজানা পাতাগুলো প্রমাণ করে যে, ১৫ অগাস্ট কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি রক্তক্ষয়ী বিভাজন, অনিশ্চয়তা ও বিশাল এক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এক নতুন ভারতের দীর্ঘ লড়াইয়ের সাক্ষী।