টাটা সাম্রাজ্যে বিরাট ভূকম্পন! চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার ঘোষণা করলেন এন চন্দ্রশেখরন, নেপথ্যে কোন গোপন সংঘাত?

৪১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিশাল টাটা সাম্রাজ্যের শীর্ষ পদে নেমে এল বড়সড় ধাক্কা। টাটা সনস (Tata Sons)-এর চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেন এন চন্দ্রশেখরন (N Chandrasekaran)। গত ছয় মাস ধরে টাটা ট্রাস্ট ও টাটা সনসের অভ্যন্তরীণ বোর্ডে তাঁর পুনরায় নিয়োগ পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে যে নজিরবিহীন ঠান্ডা লড়াই ও সংঘাত চলছিল, তারই জেরে এই চরম সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

বুধবার একটি বিবৃতিতে চন্দ্রশেখরন নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি টাটা সনসের বোর্ডকে জানিয়ে দিয়েছেন—তাঁর চলতি মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি আর পুনর্নিয়োগের দাবিদার হতে চান না। তবে হঠাৎ করে সংস্থায় কোনো শূন্যতা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি না করে মসৃণভাবে নেতৃত্ব হস্তান্তরের স্বার্থে তিনি আগামী ২০২৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁর নির্ধারিত মেয়াদ পুরোপুরি শেষ করবেন।

বিবাদের নেপথ্যে নোয়েল টাটা ও টাটা ট্রাস্টের শর্ত?
টাটা সনসের মোট ৬৬ শতাংশ মালিকানা রয়েছে মূল সংস্থা ‘টাটা ট্রাস্টস’-এর হাতে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে স্যার দোরাবজি টাটা ট্রাস্ট এবং স্যার রতন টাটা ট্রাস্ট সর্বসম্মতিক্রমে চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ আরও ৫ বছর বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। টাটা সনসের নমিনেশন ও রেমিউনারেশন কমিটিও সেই প্রস্তাবে সবুজ সংকেত দিয়েছিল।

কিন্তু আসল সমস্যার সূত্রপাত ঘটে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর টাটা সনসের বোর্ড মিটিংয়ে। সেখানে বোর্ডের এক প্রভাবশালী সদস্য এই প্রস্তাবে অসম্মতি জানান। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা (Noel Tata)-র পক্ষ থেকে কিছু কঠোর শর্ত রাখা হয়েছিল। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় দাবি ছিল—টাটা সনসকে ভবিষ্যতে কোনোদিনই শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত (IPO Listing) করা যাবে না। কিন্তু চন্দ্রশেখরন সেই শর্ত মেনে নিতে একরকম রাজি হননি। একইসঙ্গে বোর্ডে ট্রাস্টের প্রতিনিধি সংখ্যা বাড়ানো নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য চরমে ওঠে।

‘আর অনিশ্চয়তা রাখা ঠিক নয়’, ক্ষুব্ধ চন্দ্রশেখরন:
অভিমানের সুরে চন্দ্রশেখরন জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসের সেই বোর্ড মিটিংয়ের পর দীর্ঘ ছ’মাস কেটে গেলেও তাঁর পুনর্নিয়োগ নিয়ে বোর্ড কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “টাটা সনস একটি বিশাল প্রতিষ্ঠান এবং বর্তমানে অনেকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত প্রজেক্টের কাজ শেষ হওয়ার মুখে রয়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির পর কে এই সংস্থাকে নেতৃত্ব দেবেন, তা নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা রাখা সম্পূর্ণ অনুচিত। এটি কর্মচারী, বিনিয়োগকারী ও সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের জন্য ভীষণভাবে ক্ষতিকর। তাই আমি নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং বোর্ডকে অবিলম্বে নতুন উত্তরসূরি খুঁজে নেওয়ার অনুরোধ করেছি।”

টাটা গ্রুপের শেয়ারে ব্যাপক ধস:
এন চন্দ্রশেখরনের ইস্তফার খবর প্রকাশ্যে আসতেই বুধবার ভারতীয় শেয়ার বাজারে টাটা গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলোর শেয়ারে বড়সড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। দেশের বৃহত্তম আইটি রফতানিকারক সংস্থা টিসিএস (TCS)-এর শেয়ার দর হু হু করে পড়ে যায় প্রায় ৪.১ শতাংশ। পাশাপাশি, টাটা মোটরস (Tata Motors)-এর শেয়ার দর হ্রাস পায় ২.৮ শতাংশ। সার্বিকভাবে পুরো টাটা গ্রুপের শেয়ার দর প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

৪০ বছরের বর্ণাঢ্য সফর:
১৯৮৭ সালে টিসিএস-এ এক সাধারণ কর্মী হিসেবে নিজের পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন চন্দ্রশেখরন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে টাটা গ্রুপের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকার পর ২০১৭ সালে তিনি প্রথম অ-পার্সি (Non-Parsi) পেশাদার হিসেবে টাটা সনসের শীর্ষ চেয়ারম্যান পদে আসীন হন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে তাঁকে দ্বিতীয় মেয়াদে এই দায়িত্বে বহাল রাখা হয়। বিখ্যাত এয়ার ইন্ডিয়া অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্ট গড়ার মতো একাধিক ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিল তাঁরই বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।

নিজের সুদীর্ঘ চার দশকের পেশাগত জীবনের স্মৃতিচারণ করে চন্দ্রশেখরন বলেন, “আমি টাটা গ্রুপে আমার কর্মজীবনের ৪০টি বছর পূর্ণ করেছি। এই ঐতিহ্যবাহী ও সম্মানীয় প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখার অত্যন্ত সন্তোষজনক একটি সুযোগ পেয়ে আমি চিরকৃতজ্ঞ। গত এক দশক ধরে টাটা সনসকে নেতৃত্ব দেওয়া আমার জন্য এক বিশাল সম্মান এবং গভীর দায়িত্বের বিষয় ছিল।”

এদিকে তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগের ঘোষণায় আগামী দিনে টাটা গ্রুপের পরবর্তী ব্যাটন ঠিক কার হাতে উঠবে, তা নিয়ে এখন থেকেই জোর জল্পনা শুরু হয়ে গেছে কর্পোরেট মহলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *