স্বামীর কাছে রান্নার প্রতি প্লেটে ১০০০ টাকা নেন স্ত্রী! সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই দম্পতির গল্পে শোরগোল

রান্নাবান্না কিংবা ঘরের যাবতীয় কাজ মানেই আজও সমাজের একটা বড় অংশের ধারণা—সেটি কেবলই নারীদের একচ্ছত্র ও অবৈতনিক দায়িত্ব, যার বিনিময়ে মেলে না কোনো আর্থিক পারিশ্রমিক বা মানসিক স্বীকৃতি। কিন্তু সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়ের বেগে ভাইরাল হওয়া ইনস্টাগ্রাম ক্রিয়েটর প্রিয়া (@priya_whatscooking)-এর এক অভিনব ও তাক লাগানো গল্প পুরনো সেই ধ্যানধারণাকে সম্পূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। প্রিয়া তাঁর নিজের বাড়িতেই ক্যাফে স্টাইলের সুস্বাদু ও মুখরোচক খাবার তৈরি করে তার বদলে স্বামীর কাছ থেকে প্রতি প্লেটে ১০০০ টাকা করে নেন! প্রথমে বিষয়টি কেবল মজার ছলে শুরু হলেও, বর্তমানে এটি নেটদুনিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই ইস্যু কেবল একটি সাধারণ আর্থিক লেনদেন নয়, বরং এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে গৃহিণীদের অবমূল্যায়ন করা শ্রমের মর্যাদা এবং আর্থিক স্বচ্ছতার এক গভীর বার্তা।
কীভাবে শুরু হল এই অদ্ভুত চুক্তি?
ইনস্টাগ্রামের ভাইরাল ভিডিওর পাশাপাশি এক সাক্ষাৎকারে প্রিয়া স্পষ্ট জানিয়েছেন যে এই সিদ্ধান্তটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নিয়ম নয়, বরং বেশ স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। প্রিয়া ও তাঁর স্বামী প্রায়শই বাইরে বিভিন্ন ক্যাফেতে গিয়ে খাবার খেতেন এবং প্রতিবারই তাঁদের দেদার খরচ হতো প্রায় ১০০০ টাকা বা তার বেশি।
একদিন প্রিয়া নিজেই বাড়িতে নতুন নতুন রেসিপি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন এবং ক্যাফের থেকেও সুন্দর ও সুস্বাদু খাবার রান্না করতে শুরু করেন। প্রিয়ার এই অসামান্য পরিশ্রম, রান্নার সময় এবং হাতের জাদু দেখে তাঁর স্বামীই একটি চমৎকার প্রস্তাব দেন—বাইরে জলের মতো টাকা ওড়ানোর চেয়ে সেই সমপরিমাণ টাকা যদি বাড়িতেই স্ত্রীকে দেওয়া হয়, তবে কেমন হয়? আর এভাবেই দু’জনের মধ্যে এক সুশৃঙ্খল আর্থিক বোঝাপড়া গড়ে ওঠে।
রক্ষণশীল সমাজের প্রশ্ন ও প্রিয়ার কড়া জবাব:
রক্ষণশীল সমাজের একাংশের মানুষ হয়তো আজও মনে করতে পারেন যে স্বামীর জন্য রান্না করা বা সেবা করা একজন স্ত্রীর জন্মগত কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু প্রিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য, “যুগ যুগ ধরে নারীরা কোনো ধরনের আর্থিক স্বীকৃতি বা সম্মান ছাড়াই এই কাজ করে আসছেন। বাইরে গিয়ে একই ধরনের খাবার খেয়ে যখন আপনারা হাসিমুখে মোটা অঙ্কের বিল মেটান, তবে বাড়ির তৈরি স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু খাবারের বেলায় আপত্তির কারণ কী? এই ব্যবস্থায় ঘরের টাকা ঘরেই থাকছে, আমার পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে এবং আমরা দু’জনে মিলে চমৎকার একটা খাবারও উপভোগ করতে পারছি।”
জমানো টাকা খরচ হয় কোথায়?
প্রিয়া আরও পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে এই টাকা দিয়ে তিনি কোনো বিলাসবহুল ব্যক্তিগত শপিং বা নিজস্ব শখ মেটান না। বরং এই ১০০০ টাকা করে জমিয়ে দম্পতি ভবিষ্যতে একসঙ্গে একটি নতুন ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। এই পুরো বিষয়টিকে একটি সুন্দর উদাহরণের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলে প্রিয়া বলেন, “আমার স্বামী যদি আমাকে ১০০০ টাকা খরচ করে এক তোড়া ফুল কিনে দেন, তবে কেউ কোনো আপত্তি করবে না। অথচ সেই ফুলগুলো ৩-৪ দিনেই শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু এই জমানো টাকা আমাদের কাছেই গচ্ছিত থাকছে এবং আমরা এর মাধ্যমে আমাদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ বুনছি।”
সমাজের উদ্দেশ্যে প্রিয়ার বার্তা:
প্রিয়া নিজে অবশ্য চান না যে প্রতিটি বিবাহিত দম্পতি অন্ধের মতো হুবহু এই পদ্ধতি বা সিস্টেমটি অন্ধের মতো অনুকরণ করুক। তবে তাঁর এই জার্নি সমাজের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত বার্তা রেখে যায়:
বিনা পারিশ্রমিকের শ্রমের স্বীকৃতি: ঘরের কাজ, রান্না করা বা সন্তান লালনপালন করা কোনো ‘সহজ কাজ’ নয়। বেতনহীন কাজ বলেই একে অবহেলা করা বা ছোট করে দেখা এবার বন্ধ করতে হবে।
বিশেষ দিনের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিদিনের সম্মান: সঙ্গীর কাজের প্রশংসা কেবল জন্মবার্ষিকী বা বিবাহবার্ষিকীতে মহার্ঘ উপহার দিয়েই করতে হবে এমন নয়; বরং প্রতিদিনের কাজে হাত লাগোনো এবং কাজের উপযুক্ত মূল্যায়ন ও সম্মান জানানোই অনেক বড় ব্যাপার।