খাতা-কলম নয়, ত্রিপলে বসে পাঠ জীবনযাপনের! দুর্গাপুরের জঙ্গলমহলে পুলিশই মাস্টারমশাই, শেখাচ্ছে অধিকার ও সুরক্ষার পাঠ

মাটিতে পাতা ত্রিপলের ওপর পরপর বসে রয়েছেন নানা বয়সি মহিলারা। কেউ সংসার সামলানো গৃহবধূ, কেউ বা দিনমজুর। অনেকেই আবার নিজের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়েছেন এই অভিনব ক্লাসে। তবে এটি কোনো প্রথাগত বা সাধারণ টিউশন ক্লাস নয়। এখানে খাতা-কলম নিয়ে অঙ্ক, বাংলা কিংবা ইংরেজি পড়ানো হয় না; বরং এখানে শেখানো হয় জীবনযাপনের পাঠ, নিজের অধিকার জানার পাঠ এবং বিপদ থেকে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার এক অনন্য পাঠ। আর এই বিশেষ পাঠশালার শিক্ষক আর কেউ নন, স্বয়ং রাজ্য পুলিশের আধিকারিকরা!
দুর্গাপুরের জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত গ্রামের ছবি
পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর মহকুমার কাঁকসা জঙ্গলমহলের একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামের এই দৃশ্যই বর্তমানে সকলের নজর কেড়েছে। কাঁকসার বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত প্রত্যন্ত গ্রাম বিনোদনপুর, শশীপুর ও ইটাডাঙায় মলানদিঘি পুলিশ ফাঁড়ির উদ্যোগে বসেছিল এই সচেতনতার পাঠশালা। গ্রামের সাধারণ মহিলা থেকে শুরু করে অন্যান্য বাসিন্দারাও দল বেঁধে এই শিবিরে উপস্থিত হন। পুলিশ আধিকারিকরা একদম ঘরোয়া ও ক্লাস নেওয়ার ভঙ্গিতে গ্রামবাসীদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন, আর সেই শিক্ষাও অত্যন্ত মন দিয়ে গ্রহণ করেন গ্রামের মহিলারা।
মলানদিঘি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রাজেশ ভট্টাচার্যের বিশেষ উদ্যোগে এই সচেতনতা শিবিরগুলির আয়োজন করা হয়েছিল। ওই শিবিরে মলানদিঘি ফাঁড়ির পুলিশ আধিকারিক তাপস চক্রবর্তী ছাড়াও মহিলা পুলিশকর্মী এবং এলাকার ভিলেজ পুলিশকর্মীরা সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যা দূর করা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং বর্তমান সময়ের বিভিন্ন বিপদ সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
কোন কোন বিষয়ে দেওয়া হলো বিশেষ পাঠ?
পুলিশের এই সচেতনতা শিবিরে মূলত কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়:
১. বাল্যবিবাহ রোধ ও উচ্চশিক্ষা: শিবিরে নাবালিকা বিবাহ রোধ করার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে কোনো মেয়ের যাতে বিয়ে না দেওয়া হয়, সে বিষয়ে অভিভাবকদের কড়া ভাষায় সচেতন করা হয়। শুধু আইনি শাস্তির ভয় দেখিয়েই নয়, বরং মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে তাদের আত্মনির্ভর ও স্বাবলম্বী করে তোলার ওপর জোর দেন পুলিশ আধিকারিকরা। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পের সুযোগ নিয়ে মেয়েরা কীভাবে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, সেই বার্তা দেওয়া হয়।
২. পারিবারিক হিংসা ও আইনি সহায়তা: অনেক সময়ই প্রত্যন্ত এলাকার মহিলারা নানা কারণে নিজেদের ওপর চলা নির্যাতন বা পারিবারিক হিংসার কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেন না। পুলিশ তাঁদের অভয় দিয়ে জানায় যে, যেকোনো ধরনের সমস্যায় পড়লে ভয় না পেয়ে নির্দ্বিধায় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
৩. সাইবার প্রতারণা থেকে সাবধানতা: বর্তমান যুগের অন্যতম বড় আশঙ্কা হলো সাইবার ক্রাইম বা অনলাইন প্রতারণা। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের নাম করে বা লটারির লোভ দেখিয়ে ফোন, অচেনা নম্বর থেকে আসা কল, ওটিপি (OTP) শেয়ার করা কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার মতো ফাঁদ থেকে কীভাবে সাধারণ মানুষ নিজেদের সুরক্ষিত রাখবেন, তা অত্যন্ত সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দেন আধিকারিকরা।
পুলিশের বার্তা
শিবিরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মলানদিঘি ফাঁড়ির পুলিশ আধিকারিক তাপস চক্রবর্তী গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আপনারা কেউ অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে তা এড়িয়ে চলুন। অচেনা কোনো লোক এলাকায় এসে নাম-পরিচয় জানতে চাইলে তাঁকে কোনো তথ্য দেবেন না। বিশেষ করে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-সহ রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের নাম করে ভুয়া ফোন এলে অতিরিক্ত সতর্ক থাকবেন। কেউ ফোন করে ওটিপি চাইলে ভুলেও তা শেয়ার করবেন না।”
পাশাপাশি তিনি আরও জোরালোভাবে বলেন, “১৮ বছরের নিচে কোনো মেয়ের বিয়ে দেবেন না। সরকার মেয়েদের পড়াশোনার জন্য নানা প্রকল্প এনেছে। সেই প্রকল্পগুলির সুযোগ নিয়ে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলুন। মেয়েরা পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াক, এটাই আমাদের সকলের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।” পুলিশের এমন মানবিক ও সমাজমুখী উদ্যোগকে কুর্নিশ জানিয়েছেন জঙ্গলমহলের সাধারণ মানুষ।