হানিমুনের জালে জড়িয়ে দেশের গোপন তথ্য পাচার! দিল্লি পুলিশের জালে ভারতীয় বায়ুসেনার উইং কমান্ডার

সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল প্রেমের ফাঁদে পা দিয়ে দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় সামরিক তথ্য পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতার হলেন ভারতীয় বিমান বাহিনীর (IAF) এক উইং কমান্ডার। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল এবং ভারতীয় বিমান বাহিনীর নিজস্ব যৌথ গোয়েন্দা শাখার চরম তৎপরতায় এই ভয়ঙ্কর গুপ্তচরবৃত্তির চক্রের পর্দাফাঁস হয়েছে। বর্তমানে অভিযুক্ত ওই অফিসার বিচার বিভাগীয় হেফাজতে দিল্লির বিখ্যাত তিহার জেলে (Tihar Jail) বন্দি রয়েছেন।
গ্রেফতারি ও সরকারি গোপনীয়তা আইন: পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ৩১ মে, ২০২৬-এর রাতে সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য তথ্যের ভিত্তিতে এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে ওই বায়ুসেনা অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ (Official Secrets Act) বা সরকারি গোপনীয়তা আইনে নির্দিষ্ট মামলা রুজু করা হয়েছে। গোয়েন্দাদের প্রাথমিক অনুমান, এই ঘটনা কেবল একজন অফিসারের ব্যক্তিগত ভুল বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক গুপ্তচর চক্র, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতীয় সেনা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কৌশলগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া।
কীভাবে ‘হানি ট্র্যাপ’-এর ফাঁদে পা দিলেন অফিসার? তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন যে, ব্যক্তিগত জীবনের এক কঠিন ও সংকটজনক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় ওই উইং কমান্ডার সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এক মহিলার সংস্পর্শে আসেন। ধীরে ধীরে সেই আলাপচারিতা নিয়মিত চ্যাট, ভিডিও কল এবং গভীর সম্পর্কে রূপ নেয়।
অভিযোগ, ওই মহিলা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে অফিসারের বিশ্বাস অর্জন করেন এবং ধীরে ধীরে ভারতীয় সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অতি গোপন তথ্য চাইতে শুরু করেন। গোয়েন্দাদের জোরালো সন্দেহ, সোশ্যাল মিডিয়ার নেপথ্যে থাকা ওই নারী আদতে পাকিস্তানের কোনো গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন এবং সুপরিকল্পিতভাবে ‘হানি ট্র্যাপ’ (Honeytrap) বা প্রেমের ফাঁদে ফেলেই এই তথ্য হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত অফিসার বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের গতিবিধি, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনার মোতায়েন সংক্রান্ত ছবি, ভিডিও এবং বেশ কিছু গোপন নথি ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে ওই মহিলার কাছে পাচার করেছিলেন।
স্পাইওয়্যার ইনস্টল করার ভয়ঙ্কর চক্রান্ত: এই তদন্তের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও বিপজ্জনক দিকটি সামনে এসেছে যখন গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন যে, ওই মহিলা অভিযুক্ত উইং কমান্ডারকে তাঁরই এক সহকর্মীর মোবাইল ফোনে একটি বিশেষ অ্যাপ ইনস্টল করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন এবং রাজিও করিয়েছিলেন।
পুলিশ ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ওই অ্যাপটি আসলে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী স্পাইওয়্যার (Spyware) বা রিমোট-অ্যাক্সেস ম্যালওয়্যার ছিল। এই ধরনের ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে টার্গেট ফোনের সম্পূর্ণ দখল নেওয়া, গোপনে ছবি ও তথ্য চুরি করা এবং লাইভ কথোপকথনে আড়ি পাতা সম্ভব। এর অর্থ দাঁড়ায়, কেবল অভিযুক্ত উইং কমান্ডার একা নন, বরং এই ম্যালওয়্যারের সাহায্যে ভারতীয় সেনার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের মোবাইল এবং আরও অনেক স্পর্শকাতর তথ্যের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছিল।
বর্তমানে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি যৌথভাবে খতিয়ে দেখছে ঠিক কতটা পরিমাণ গোপন তথ্য ইতিমধ্যেই পাকিস্তানপন্থী হ্যান্ডলারদের কাছে পৌঁছে গেছে এবং এই নাশকতামূলক চক্রের সঙ্গে দেশের ভেতর বা বাইরে আর কারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করার এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দেশের প্রতিরক্ষা মহলে চরম চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে।