কোন কনটেন্ট কার ফিডে যাবে তা ঠিক করলেই কি দিতে হবে আইনি দায়িত্ব? মেটার সঙ্গে সরকারের বৈঠকে বড় মোড়!

ডিপফেক (Deepfake), ভুয়ো তথ্য এবং ক্ষতিকর কন্টেন্ট রোখা নিয়ে মেটা (Meta)-র বিরুদ্ধে এবার আরও কঠোর অবস্থান নিল কেন্দ্রীয় সরকার। মেটার গ্লোবাল টিমের সঙ্গে কেন্দ্রের একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর ভারতীয় আইনে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে এক বড় আইনি প্রশ্ন সামনে এসেছে।

ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলিতে কোন কনটেন্ট কোন ব্যবহারকারীর কাছে দেখানো হবে, কোন পোস্ট বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে এবং প্রমোশন বা টাকার বিনিময়ে কোনও কন্টেন্ট ছড়ানো হচ্ছে কি না—এই সমস্ত সিদ্ধান্ত যদি প্ল্যাটফর্ম নিজেই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে নেয়, তবে ভারতীয় আইনে তাদের কেবল ‘ইন্টারমিডিয়ারি’ (Intermediary) হিসেবে দেখা হবে, নাকি সংবাদমাধ্যমের মতো ‘পাবলিশার’-এর (Publisher) দায়িত্ব নিতে হবে? সরকারি সূত্রে এই প্রশ্নই জোরালোভাবে তোলা হয়েছে।

আইনজীবীদের নজরে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯ ধারা: মূল বিতর্কটি ঘুরছে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের (IT Act) ৭৯ নম্বর ধারাকে ঘিরে। এই ধারায় নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে চললে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি ব্যবহারকারীদের আপলোড করা থার্ড-পার্টি কন্টেন্টের জন্য আইনি সুরক্ষা বা ‘সেফ হারবার’ (Safe Harbor) পেয়ে থাকে। তবে এই সুরক্ষা বজায় রাখতে হলে আইটি অ্যাক্ট এবং ইনফরমেশন টেকনোলজি রুলস, ২০২১ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ বা যথাযথ সতর্কতা মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

সাধারণত সোশ্যাল মিডিয়াগুলি ইউজার জেনারেটেড কন্টেন্ট বা ইউজিসির (UGC) ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ, প্ল্যাটফর্মগুলি কেবল মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং ব্যবহারকারীদের আপলোড করা কনটেন্টের সরাসরি দায়ভার তাদের ওপর বর্তায় না। তবে সরকারের দাবি, কোনও প্ল্যাটফর্ম যদি নিজস্ব রেকমেন্ডেশন সিস্টেমের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে ঠিক করে দেয় যে কোন কনটেন্ট কাকে দেখানো হবে, তখন সেই ভূমিকা পুরোপুরি একটি নিরপেক্ষ মাধ্যমের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে কি না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

কী নিয়ে আলোচনা হল মেটার সঙ্গে? সম্প্রতি মেটার গ্লোবাল টিমের সঙ্গে বৈঠকে কেবল রেকমেন্ডেশন অ্যালগরিদমই নয়, বরং নিম্নলিখিত গুরুতর বিষয়গুলি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে:

  • ডিপফেক ও ভুয়ো কনটেন্ট: প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তৈরি ডিপফেক ভিডিও এবং ভুয়ো তথ্যের দ্রুত বিস্তার রোধ।

  • সিএসএএম (CSAM): শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত ক্ষতিকর কন্টেন্ট (Child Sexual Abuse Material) প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো বন্ধ করা।

  • এআই কনটেন্ট: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) দ্বারা প্রস্তুত কিন্তু লেবেল না করা কন্টেন্ট শনাক্ত করা।

পরবর্তী পদক্ষেপ কী? কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এখনও চূড়ান্ত কোনও আইনি পদক্ষেপ বা শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে মেটার সঙ্গে হওয়া আলোচনার ফলাফল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে মেটাসহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি ভারতীয় আইনে ‘ইন্টারমিডিয়ারি’-র শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রের। এই পর্যালোচনা সফল না হলে ভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টগুলির আইনি সুরক্ষাকবচে বড় ধরনের কোপ পড়তে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *