কলকাতায় বন্ধ জন্ম ও মৃত্যুর সার্টিফিকেট পরিষেবা! শ্মশানে শেষকৃত্য হলেও মিলছে না ডেথ সার্টিফিকেট, চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal Corporation)-র জন্ম ও মৃত্যু সংক্রান্ত অনলাইন পোর্টাল দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকায় শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে এক বিরাট সংকট। প্রিয়জনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়ে গেলেও মিলছে না ডেথ সার্টিফিকেট, আবার অন্যদিকে বার্থ সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে বহু মানুষকে। এর জেরে পেনশন তোলা, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত কাজ, বিমার দাবি মেটানো, সম্পত্তি হস্তান্তর থেকে শুরু করে পাসপোর্ট তৈরির মতো একাধিক জরুরি আইনি ও দাপ্তরিক কাজ পুরোপুরি আটকে গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও হয়রানি
বেঙ্গালুরু থেকে বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে কলকাতা ছুটে এসেছিলেন শিলাদিত্য লাহিড়ি। কেওড়াতলা শ্মশানে সমস্ত নিয়ম মেনে শেষকৃত্য সম্পন্ন হলেও তিনি এখনও হাতে ডেথ সার্টিফিকেট পাননি। এমনকী, অনলাইন লিঙ্কের মাধ্যমে সার্টিফিকেট ডাউনলোড করার কথা থাকলেও সেটিও তাঁর মোবাইলে পৌঁছয়নি। বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পর মা’কে নিয়ে বেঙ্গালুরু ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও সার্টিফিকেট না পাওয়ায় তাঁকে বাধ্য হয়ে কলকাতাতেই আটকে থাকতে হচ্ছে। শ্মশানে যোগাযোগ করলে তাঁকে পুরসভায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, আর পুরসভা থেকে দেওয়া হচ্ছে শুধু একটি ফোন নম্বর।
একই রকম চরম ভোগান্তির শিকার বালিগঞ্জের বাসিন্দা পরাগ সেনও। পরিবারের এক আত্মীয়ের মৃত্যুর পর কেওড়াতলা শ্মশান থেকে তাঁকে শুধুমাত্র শেষকৃত্যের খরচের একটি রসিদ দেওয়া হয়েছে। সার্টিফিকেট ছাড়া মৃত ব্যক্তির পেনশন চালু করা, ফ্যামিলি পেনশন, ব্যাঙ্কের টাকা তোলা বা সম্পত্তি সংক্রান্ত কোনো কাজই করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছে একাধিক পরিবার।
শ্মশানে প্রতিদিনের কাজের চাপ ও স্তূপীকৃত সমস্যা
কলকাতা পুরসভা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী:
কেওড়াতলা শ্মশানে প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ১০০টি দেহ দাহ করা হয়।
নিমতলা শ্মশানে এই সংখ্যাটা প্রতিদিন প্রায় ১00 থেকে ১২০টি।
এছাড়াও শহরের অন্যান্য শ্মশানগুলি মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫০টি শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
কিন্তু জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে কারও হাতেই সময়মতো ডেথ সার্টিফিকেট পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠছে। শুধু ডেথ সার্টিফিকেট নয়, বার্থ সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ এক। মানিকতলার বাসিন্দা রাজা সরখেল মেয়ের পাসপোর্ট নবীকরণের জন্য প্রায় এক মাস আগে ডিজিটাল বার্থ সার্টিফিকেটের আবেদন করলেও এখনও কোনো নথি পাননি।
কেন বন্ধ রয়েছে পোর্টাল?
পুরসভা ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার সময় জমা পড়া কিছু জন্ম ও মৃত্যু সংক্রান্ত নথি নিয়ে কিছু অসঙ্গতি ও সন্দেহ তৈরি হয়। এর পরেই বিষয়টি নিয়ে পুলিশি তদন্ত শুরু হওয়ায় নিরাপত্তার খাতিরে আপাতত অনলাইন পোর্টালটি বন্ধ রাখা হয়েছে। শুধু কলকাতা নয়, এর জেরে সল্টলেকসহ রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলেও একই রকম সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষকে।
প্রতিদিন কলকাতার পুরসভা সদর দপ্তর এবং বিভিন্ন বোরো অফিসে সার্টিফিকেট সংগ্রহের জন্য সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লাইন ও ভিড় বাড়ছে। তবে আশার কথা এই যে, পুরসভার একটি গোপন সূত্রের দাবি অনুযায়ী— আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে এই পোর্টালটি ফের চালু হতে পারে। যদিও সরকারিভাবে এখনও কোনো লিখিত বা চূড়ান্ত ঘোষণা না আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা কাটেনি।