‘ডিল করতে চাইলে ২৬ দিনের অনশন করতাম না!’ বিস্ফোরক অভিযোগে কেন্দ্রকে ধুয়ে দিলেন সোনম

কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কথা দিয়ে তা না রাখার মারাত্মক অভিযোগ তুলে ফের একবার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন প্রখ্যাত পরিবেশবিদ তথা সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তাঁর ২৬ দিনের দীর্ঘ অনশন ভাঙানোর সময় তোলা ছবি এবং খবর যেভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, তা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। ওয়াংচুকের স্পষ্ট দাবি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা তাঁকে যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পরে তার একটিও রক্ষা করা হয়নি। এই ঘটনার পর দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর থেকে তাঁর সমস্ত আস্থা চিরতরে নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
অনশনের নেপথ্য কাহিনী ও হাসপাতালের সেই রাত
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে সোনম ওয়াংচুক জানান যে, নিট (NEET) পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে চলা বিতর্ক এবং দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি নিয়েই তিনি আমরণ অনশনে বসেছিলেন। টানা ২৬ দিন অনশন চলার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। এর পরেই তাঁকে দিল্লি থেকে সরাসরি গুরগাঁওয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে (মেদান্ত) স্থানান্তরিত করা হয়।
গত ২৪ জুলাই গভীর রাতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং হাসপাতালে সশরীরে হাজির হন এবং জুস বা স্যুপ খাইয়ে তাঁর অনশন ভাঙান।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
সোনম ওয়াংচুকের দাবি, অনশন ভাঙানোর আগে সরকারের সঙ্গে তাঁর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট শর্ত বা আলোচনা হয়েছিল। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, শুধুমাত্র শাসকদলের মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে অনশন ভাঙানোর ছবি যেন কোনওভাবেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না করা হয়, কারণ তাতে সাধারণ মানুষের কাছে একটি অত্যন্ত ভুল রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছাতে পারে।
তাঁর সুনির্দিষ্ট ইচ্ছা ছিল, বিরোধী দলের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতিতে যৌথভাবে একটি ইতিবাচক বার্তা ও ছবি সংবাদমাধ্যমের সামনে আনা হবে। সেই ছবি এবং যৌথ বিবৃতি একসঙ্গে প্রেসের কাছে পাঠানোর কথা ছিল।
লাদাখের এই সমাজকর্মীর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা তাঁর সেই সমস্ত শর্ত মেনে নেওয়ার সম্পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছিলেন। এমনকি, সেই বৈঠকে উপস্থিত ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB)-এর একাধিক শীর্ষ আধিকারিকও এই গোপন আলোচনার সাক্ষী ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে বিন্দুমাত্র সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি।
অনশন ভাঙার ৫ মিনিটের মধ্যেই ছবি ফাঁস!
ওয়াংচুকের অভিযোগ, তাঁকে জুস খাইয়ে অনশন ভাঙানোর মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সমস্ত ছবি দেশের বিভিন্ন সর্বভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে এবং মিডিয়াতে সম্প্রচারিত হতে শুরু করে। পরবর্তীতে এক আইবি (IB) আধিকারিক এসে তাঁকে জানান যে ছবিগুলি ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমের হাতে পৌঁছে গিয়েছে। এই পূর্বপরিকল্পিত ও বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ ঘটনাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি মর্মাহত ও হতাশ করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
গোপন সমঝোতা বা ‘মিডনাইট ডিল’-এর তত্ত্ব খারিজ
সরকারের সঙ্গে তাঁর কোনও ধরনের গোপন রাজনৈতিক সমঝোতা বা ‘মিডনাইট ডিল’ হয়েছিল কি না— এমন সমস্ত গুঞ্জন ও অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন সোনম ওয়াংচুক। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন:
“ডিল করতে চাইলে ২৬ দিন অনশন করার দরকার হতো না। চাইলে অনেক আগেই নিজের জন্য কোনও পদ বা বিশেষ সুবিধা চাইতে পারতাম। কিন্তু আমি আন্দোলনে নেমেছিলাম সম্পূর্ণভাবে নীতির প্রশ্নে।”
জনস্বার্থে ও শিক্ষার অধিকারের দাবিতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভঙ্গ করায় তিনি গভীরভাবে আঘাত পেয়েছেন। সোনমের এই বিস্ফোরক এবং চাঞ্চল্যকর মন্তব্য ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে ফের একবার নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে কেন্দ্রের শাসক শিবিরের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি, তবে শিক্ষা সংস্কার নিয়ে তাঁর এই লড়াকু মনোভাব আগামী দিনে কী মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ।