দত্তক দেওয়ার নামে লক্ষাধিক টাকার প্রতারণা! ভুয়া ডাক্তার সহ আন্তঃরাজ্য চক্রের দুই পাণ্ডাকে ধরল পুলিশ

শিশু দত্তক (Adoption) দেওয়ার ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে লাখ লাখ টাকা প্রতারণা করা একটি আন্তঃরাজ্য চক্রের সন্ধান পেল দিল্লি পুলিশ। দিল্লির সাইবার নর্থ থানা এই ঘটনায় উত্তর প্রদেশের বরেলি থেকে দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। অভিযুক্তরা আইনিভাবে একটি শিশু দত্তক দেওয়ার নাম করে দিল্লির এক মহিলার কাছ থেকে একাধিক কিস্তিতে প্রায় ১ লক্ষ ৩৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। অনলাইনে শিশু দত্তক নেওয়ার তথ্য খোঁজার সময়ই ওই মহিলা এই চক্রের খপ্পরে পড়েন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দিল্লির বুরারির ৩০ বছর বয়সী এক মহিলা অনলাইনে শিশু দত্তক নেওয়ার বিষয়ে তথ্য খুঁজতে গিয়ে একটি মোবাইল নম্বরের সন্ধান পান। শচীন আগরওয়াল পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন ধরে নিজেকে শিশু দত্তক পরিষেবা প্রদানকারী একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করে। শচীন ওই মহিলাকে আশ্বস্ত করে যে, সে খুব সহজেই তাকে একটি শিশু দত্তক নিতে সাহায্য করতে পারবে। কিছুদিন পর সে মহিলাকে জানায় যে দত্তক নেওয়ার মতো একটি শিশু পাওয়া গেছে এবং এরপর রেজিস্ট্রেশন, বুকিং ও অন্যান্য বাহানা দিয়ে দফায় দফায় টাকা চাইতে শুরু করে।

জাল কাগজপত্র দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন
মহিলার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য বিভিন্ন ফন্দি আঁটত ওই প্রতারকরা। কখনও রেজিস্ট্রেশন ফি, কখনও বুকিং চার্জ, আবার কখনও শিশুটির যাতায়াতের খরচ বাবদ টাকা চাওয়া হতো। ভুক্তভোগীকে পুরোপুরি বিশ্বাস করানোর জন্য অভিযুক্তরা জাল এনজিও রসিদ, জাল আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট এবং অন্যান্য ভুয়া ডাক্তারি কাগজপত্র পাঠিয়েছিল। এমনকি মহিলাকে শিশুটির জন্য জামাকাপড় কিনতে বলা হয় এবং নির্দিষ্ট দিনে শিশুটিকে তার হাতে তুলে দেওয়ার ভুয়া প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।

যখন মহিলা শিশুটির জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চান, তখন অভিযুক্তরা সাফ জানিয়ে দেয় যে সংস্থার নীতি অনুযায়ী দত্তক গ্রহীতা ও জন্মদাত্রী মায়ের আগে দেখা করার নিয়ম নেই। এরপর নির্ধারিত দিনে শিশুটির যাতায়াত বা গাড়ি ভাড়ার কথা বলে শেষ কিস্তির টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরই অভিযুক্তরা ফোন বন্ধ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। প্রতারিত হয়েছেন বুঝতে পেরে ভুক্তভোগী ১৯৩০ সাইবার ক্রাইম হেল্পলাইনে অভিযোগ জানান এবং ই-এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়।

১০০টি মোবাইল নম্বর স্ক্যান করে বরেলিতে হানা
ঘটনার তদন্তে এসআই অরবিন্দ যাদবের নেতৃত্বে একটি বিশেষ পুলিশ দল গঠন করা হয়। তদন্তকারীরা প্রায় ১০০টি মোবাইল নম্বর এবং আইএমইআই (IMEI) নম্বরের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন এবং ফ্লিপকার্ট, সুইগি ও ব্লু ডার্টের মতো অনলাইন পরিষেবাগুলোর ডেটাও খতিয়ে দেখা হয়।

অবশেষে লাগাতার প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমে অভিযুক্তদের অবস্থান বরেলিতে নিশ্চিত করে পুলিশ। গত ৩১ জুলাই বরেলিতে অভিযান চালিয়ে শচীন আগরওয়াল এবং রাকেশ কুমার ওরফে ডঃ আরকে-কে গ্রেপ্তার করা হয়।

ভুয়া সিল ও নথিপত্র উদ্ধার
পুলিশি তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পেশায় ফিজিওথেরাপিস্ট রাকেশ কুমার এই চক্রের জন্য জাল এনজিও রসিদ, ভুয়া আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট এবং অন্যান্য চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি তৈরি করত। এই ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়েই ভুক্তভোগীদের বোঝানো হতো যে পুরো প্রক্রিয়াটি আইনি ও স্বচ্ছ।

অভিযুক্তদের কাছ থেকে পুলিশ দুটি মোবাইল ফোন, পাঁচটি সিম কার্ড, একটি ব্যাংক পাসবুক, ছয়টি ডেবিট কার্ড, দুটি প্যান কার্ড এবং হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ১৪টি জাল সিলমোহর উদ্ধার করেছে। এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা এবং তারা আর কারোর সঙ্গে প্রতারণা করেছে কিনা, সে বিষয়ে বর্তমানে গভীর তদন্ত চালাচ্ছে দিল্লি পুলিশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *