ভোজপুর এনকাউন্টার কাণ্ডে বড় মোড়! এসটিএফ জওয়ান গ্রেপ্তারের পর মুখ খুলল মৃত যুবকের পরিবার!

বিহারের ভোজপুর জেলার চাঞ্চল্যকর ভারত তিওয়ারি এনকাউন্টার মামলায় অবশেষে এক এসটিএফ (STF) জওয়ানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যে দলটি ওই এনকাউন্টার অভিযানে অংশ নিয়েছিল, এই জওয়ান সেই দলেরই সদস্য। ধৃত জওয়ানের নাম অক্ষয় কুমার। নিহত যুবকের পরিবারের শুরু থেকেই জোরালো অভিযোগ ছিল যে, এই অক্ষয়ই ভরতকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলি চালিয়েছিল। তবে পরিবারের স্পষ্ট দাবি, মাত্র একজনের গ্রেপ্তারিতেই এই মামলার পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার মিলেছে বলে তারা মনে করছে না; বরং এনকাউন্টারের সাথে যুক্ত সমস্ত পুলিশকর্মী ও অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।

নিহত ভারত তিওয়ারির মা আশা দেবী জানিয়েছেন, সম্প্রতি উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর সাথে সাক্ষাতের পর সরকারের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তাঁদের আশা কিছুটা বেড়েছে। সরকার তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু করলেও, এই লড়াই তখনই শেষ বলে গণ্য হবে যখন ঘটনার নেপথ্যে থাকা সমস্ত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। পরিবারের সাফ কথা, তাঁদের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আসল সত্য সামনে আনা।

ভাই ও ভাবীর বিস্ফোরক দাবি
ভারতের ভাই চন্দন তিওয়ারি জানিয়েছেন, এসটিএফ জওয়ান অক্ষয় কুমারের এই গ্রেপ্তারি বিচার ব্যবস্থার প্রতি পরিবারের আস্থাকে কিছুটা হলেও মজবুত করেছে। তবে ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ না করা পর্যন্ত তাঁরা শান্ত হবেন না। পাশাপাশি, ভারতের ভাবী সুমন দেবীও একই সুরে জানান যে, প্রথম গ্রেপ্তারিতে আশার আলো দেখা গেলেও সব দোষী ধরা না পড়া পর্যন্ত ন্যায়বিচার অধরাই থেকে যাবে।

ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও পুলিশের এফআইআর ঘিরে যত প্রশ্ন
এই পুরো এনকাউন্টার মামলাটি শুরু থেকেই তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, বিশেষ করে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর।

রিপোর্টে কী ছিল? ময়নাতদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ভারত তিওয়ারির শরীরে মোট পাঁচটি বুলেট বিদ্ধ হয়েছিল। তাঁর বাম ও ডান উরুতে দুটি করে মোট চারটি এবং বাম পায়ের পেছনের অংশে পঞ্চম বুলেটটি লেগেছিল। মৃতদেহের এমন দশা দেখে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা পর্যন্ত শিউরে উঠেছিলেন।

পুলিশের বয়ান: অন্যদিকে, এফআইআর (FIR)-এ দাবি করা হয়েছিল যে এসটিএফ জওয়ানরা সম্পূর্ণ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছিলেন। তৎকালীন থানা ইনচার্জ রাজেশ মালাকারও এক রাউন্ড গুলি চালিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়, যদিও তাঁর গুলি গায়ে লেগেছিল কি না তা স্পষ্ট করা হয়নি। পুলিশের দাবি, ধাওয়া করার পর ভারত পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে, যা সরকারি গাড়ির বনেটে গিয়ে লাগে। বারবার আত্মসমর্পণের चेतावनी দেওয়া সত্ত্বেও সে থামেনি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এক হাতে মোবাইল ও অন্য হাতে পিস্তল থাকা অবস্থায় সে একবার অস্ত্র ফেললেও জওয়ান যখন তা তুলতে যান, তখন সে ফের অস্ত্র তুলে দু’রাউন্ড গুলি চালায়। এর পরেই আত্মরক্ষার্থে এসটিএফ জওয়ান অক্ষয় কুমার কোমর থেকে নিচের অংশে চার রাউন্ড গুলি চালান, যার জেরে ভারত মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুটি কারতুসের খোসা, একটি দেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও দুটি তাজা কার্তুজ উদ্ধারের দাবি করে। পাশাপাশি তৎকালীন থানার ইনচার্জ, এসটিএফ জওয়ান এবং অভিযুক্তের সার্ভিস পিস্তল বাজেট করা হয়েছে।

কী ছিল ভারত তিওয়ারি এনকাউন্টার কাণ্ড?
গত ১৭ জুন সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়ে ফেসবুক লাইভে এসেছিলেন ভারত ভূষণ তিওয়ারি। সেই লাইভ ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায় যে, তিনি একটি নিজন এলাকায় রয়েছেন এবং তাঁর সামনে এসটিএফ ও ভোজপুর পুলিশ বাহিনী উপস্থিত রয়েছে। নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে তিনি লাইভেই জানান যে পুলিশ তাঁকে ধরতে এসেছে এবং এরপর তিনি নিজের অস্ত্রটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণের কথা বলে ফেসবুক লাইভ বন্ধ করে দেন।

পুলিশের দাবি, লাইভ বন্ধ হওয়ার ঠিক পরেই ভারত ফের পিস্তল তুলে গুলি চালানোর চেষ্টা করে, যার জবাবে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা প্রথম থেকেই পুলিশের এই দাবিকে সর্বৈব মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং এটিকে একটি ‘পরিকল্পিত ভুয়ো এনকাউন্টার’ (Fake Encounter) বলে অভিহিত করে আসছেন। এখন এসটিএফ জওয়ানের গ্রেপ্তারের পর এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত সম্পূর্ণ নতুন মোড় নিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *