জ্যান্ত কেউটে সাপকে হাতে নিয়ে দেবীর পুজো! ভয়ে বুক কাঁপে না এই গ্রামের মানুষের, আসল রহস্য কী?

জলজ্যান্ত আস্ত কালকেউটেকে হাতে তুলে পুজো! ঠিক যেন সুকুমার রায়ের ছড়ার সেই জগৎ— ‘কাউকে যে কাটে না, করে নাকো ফোঁসফোঁস।’ তবে এ কোনও রূপকথার গল্প বা কল্পনার ছড়া নয়, বরং পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের পলসোনা গ্রামের সম্পূর্ণ বাস্তব চিত্র।
গ্রামের আনাচে-কানাচে, গৃহস্থের ঘরে, কখনও দরজার ফাঁকে কিংবা খাটের তলায় অবলীলায় ঘুরে বেড়ায় বিষধর কেউটে সাপ। আর সেই সাপকেই গ্রামের মানুষ কোনো ভয় না পেয়ে বসিয়েছে খোদ দেবীর আসনে। তাঁদের কাছে এই সাপ কোনো সাধারণ সরীসৃপ নয়, সাক্ষাৎ ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’।
জ্যান্ত কেউটের আরাধনা ও লোকাচার
প্রতি বছর গুরুপূর্ণিমার পরের দিন অত্যন্ত মহা সমারোহে উদযাপিত হয় মা ঝঙ্কেশ্বরীর পুজো। পুজোর দিন যে নির্দিষ্ট জায়গায় সাপটির দেখা মেলে, সেখান থেকেই তাকে সসম্মানে নিয়ে আসা হয়। এরপর গঙ্গাজল দিয়ে স্নান করানো ও হলুদ মাখানোর পর অন্যান্য দেবদেবীর মতোই নিখুঁত নিয়মে চলে পুজোর সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান। শুধু কোনো সাধারণ মূর্তি নয়, এখানে খোদ জ্যান্ত বিষধর সাপকেই দেবীরূপে পুজো করা হয় এবং সেই সাপকে হাসিমুখে হাতে তুলে নিয়েই চলে ভক্তদের আরাধনা।
তবে এই গল্প কেবল একদিনের পুজোর নয়। বছরের অন্যান্য সময়েও এই গ্রামের মানুষ ও সাপের সহাবস্থান এক বিরল দৃশ্যের জন্ম দেয়। বাড়ির উঠোনে, ঘরের ভেতর কিংবা খাটের তলায়— যেখানেই সাপের দেখা মিলুক না কেন, গ্রামবাসীদের মনে কোনো আতঙ্কের লেশমাত্র থাকে না। ছোটবেলা থেকেই এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে বড় হওয়া গ্রামবাসীদের কাছে সাপ কোনো ভয়ের বস্তু নয়, বরং পরিবারেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
গ্রামের বাসিন্দা প্রিয়া মুখোপাধ্যায় জানান, ছোটবেলা থেকে দিনরাত মায়ের সঙ্গেই তাঁদের বেড়ে ওঠা। বাড়ির আনাচে-কানাচে সাপ ঘুরলেও তাঁরা কখনো ভয় পান না। সাপের কারণে সামান্য কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাকে বড় করে না দেখে তাঁরা সহজ মনে বলেন, ‘মা প্রসাদ দিয়েছেন।’ অর্থাৎ, সাপের দংশনের ঘটনাকেও এখানে সম্পূর্ণ অন্য নজরে দেখা হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই বিশ্বাসের শিকড় কতটা গভীরে, তা প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরে। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস, মা ঝঙ্কেশ্বরী কেবল কোনো দেবী নন, তিনিই গোটা গ্রামের মূল রক্ষাকর্তা।
এই পুজোকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে রয়েছে আরও বহু প্রাচীন লোকাচার। সন্ধ্যার সময় গ্রাম পরিক্রমার পর মন্দিরের সামনে মাটি ভাঙার বা কলস ভাঙার এক বিশেষ রীতি পালন করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, সেই কলসের টুকরো বাড়িতে যত্ন করে রাখলে আশেপাশে আর কোনো বিষধর সাপ ঘেঁষে না। স্থানীয়দের মতে, মনসামঙ্গল কাব্যে বর্ণিত বেহুলা-লখীন্দরের ঐতিহাসিক কাহিনির সঙ্গেও এই বিশ্বাসের নিবিড় যোগ রয়েছে।
পলসোনা থেকে সাতটি গ্রাম: লোকসংস্কৃতির বিস্তার
এই অদ্ভুত পুজো কেবল পলসোনা গ্রামেই সীমাবদ্ধ নেই। মঙ্গলকোটের ছোটপোষলা, মুসুরি, নিগন এবং ভাতারের বড়পোষলা, শিকোত্তর ও মুকুন্দপুর-সহ মোট সাতটি গ্রামে এই ঝঙ্কেশ্বরী পুজোর প্রচলন রয়েছে। তবে, পলসোনায় সাপের সঙ্গে মানুষের এই নিবিড় সহাবস্থান সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে বলেই দাবি করেন স্থানীয়রা।
প্রতি বছর এই বিরল ধর্মীয় ঐতিহ্য ও উৎসবের সাক্ষী থাকতে দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ ভিড় জমান। পুজোকে কেন্দ্র করে বসা মেলায় গোটা গ্রাম কয়েক দিনের জন্য এক আনন্দমুখর উৎসবের আঙিনায় পরিণত হয়। এই বিশেষ পুজোয় হাজির হন বিশিষ্ট জনপ্রতিনিধিরাও। মঙ্গলকোটের বিধায়ক শিশির ঘোষ মায়ের দরবারে প্রার্থনা করে মঙ্গলকোটবাসীর সুস্থতা, শান্তি এবং সমগ্র এলাকার উন্নতির জন্য আশীর্বাদ চেয়েছেন। তাঁর কাছে এই পুজো নিছক কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য অঙ্গ।
বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস: কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
শত বছরের এই বিশ্বাসের ভিড়ে মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে— একটি বিষধর সাপ কীভাবে বছরের পর বছর মানুষের এত কাছাকাছি থাকতে পারে? আর দংশন করলেও কেন অনেক সময় সেই বিষ প্রাণঘাতী হয় না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ধর্মীয় ভাবাবেগের পাশাপাশি আলোকপাত করতে হয় বিজ্ঞানের যুক্তিতে।
প্রায় তিন দশক ধরে ঝঙ্কেশ্বরী হিসেবে পূজিত এই মনোক্লেড কোবরা (Monocled Cobra) নিয়ে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা চালাচ্ছেন সর্প বিশেষজ্ঞ ধীমান ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, এই সাপের বৈজ্ঞানিক নাম ন্যাজা কাউথিয়া (Naja Kaouthia) এবং এটি অত্যন্ত বিষধর। তবে যেকোনো সাপের আচরণ মূলত নির্ভর করে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং মানুষের আচরণের ওপর।
বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একেবারে জুভেনাইল স্টেজে ডিম ফুটে বেরোনোর পর এই সাপ যথেষ্ট ডিফেন্সিভ বা আত্মরক্ষামূলক থাকে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আচরণ অনেকটাই শান্ত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ যদি সাপটিকে অকারণে বিরক্ত না করে এবং তাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে, তবে একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়। আর এখানেই ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রকৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি, দংশনের পরেও বিষের মাত্রা কম থাকার পেছনেও রয়েছে শক্তপোক্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তি। মনোক্লেড কোবরা সব সময় একই পরিমাণে বিষ তার শিকার বা শত্রুর শরীরে প্রবেশ করায় না। পরিস্থিতি অনুযায়ী বিষের পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে। এই প্রজাতির সাপের স্পিটিং বিহেভিয়ারও দেখা যায়। অর্থাৎ, কিছু ক্ষেত্রে দংশনের আগে বিষ ছিটিয়ে দিলে পরবর্তী দংশনের সময় বিষের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকতে পারে।
তাছাড়া, মানুষ তো সাপের প্রধান খাদ্য নয়; সাপ মূলত নিজের আত্মরক্ষার তাগিদেই দংশন করে থাকে। ফলে প্রতিটি দংশনের সময় সমপরিমাণ বিষ শরীরে প্রবেশ করবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিষের মাত্রা প্রাণঘাতী পর্যায়ে না পৌঁছলেও দংশনের স্থানে ফোলা, জ্বালা, তীব্র যন্ত্রণা বা সেলুলাইটিসের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এই সাপের দংশন সম্পূর্ণ নিরাপদ। বিষধর কেউটের কামড় যে কোনো সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, তাই একে কখনই হালকাভাবে দেখা উচিত নয়—এমনটাই মত চিকিৎসকদের।
একদিকে ধর্মীয় বিশ্বাস বলে তিনি মা ঝঙ্কেশ্বরী—গ্রামের পরম রক্ষাকর্ত্রী, অন্যদিকে বিজ্ঞান বলে দীর্ঘদিনের সহাবস্থান, সাপের স্বাভাবিক আচরণ এবং বিষ ব্যবহারের বিশেষ কৌশলেই লুকিয়ে রয়েছে এই গভীর রহস্যের উত্তর। বিশ্বাসের আলোয় মোড়া এই জনপদের মানুষ যুগ যুগ ধরে এই অদ্ভুত মেলবন্ধনকেই আঁকড়ে বেঁচে রয়েছেন।