বাসচালক থেকে একেবারে ‘ধনকুবের’! বীরভূমের মিনার মণ্ডলের আলিমারি থেকে উদ্ধার ২৮ কোটি টাকা ও ১৫ কেজি সোনা

মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে একটানা ২৫ ঘণ্টা ধরে চলেছিল টাকা গোনার মহাযজ্ঞ। বীরভূমের মহম্মদবাজার থানা এলাকার একটি বাড়ি থেকে টাকা গোনার মেশিন নিয়ে বসে আধিকারিকদের কালঘাম ছুটে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল, কারণ আলমারি থেকে যেন টাকা শেষ হওয়ার নামই নিচ্ছিল না! বৃহস্পতিবার সকালেই স্পষ্ট হয় সেই চাঞ্চল্যকর হিসাব—আলমারি ও বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার হওয়া মোট নগদ টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা! শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি উদ্ধার হয়েছে ১৫ কেজির সোনা, যার বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। কিন্তু এত সোনা ও নগদ টাকার মালিক এই মিনার মণ্ডল আদতে কে? সাধারণ এক বাসচালক কীভাবে হয়ে উঠলেন ‘ধনকুবের’?
মিনার মণ্ডলের আসল পরিচয় ও উত্থানের গল্প
একসময় সাধারণ সরকারি বাসের চালক হিসেবে কাজ করতেন মিনার মণ্ডল। সম্পর্কে তিনি এলাকার প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল ওরফে নিজামুদ্দিনের শ্যালক।
টুলু মণ্ডলের প্রভাব: টুলু ওরফে নিজামুদ্দিন পাথর ও বালি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে বহুবার নানা বিতর্কে নাম জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দাপট এতটাই বেশি ছিল যে, নিজের মেয়ের বিয়েতেই তিনি প্রায় ১৫০ কোটি টাকা খরচ করেছিলেন বলে শোনা যায়।
বাসচালক থেকে ব্যবসায়ী: এই টুলুর সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে মিনার মণ্ডলের। বাসের স্টিয়ারিং ছেড়ে তিনি জামাইবাবুর হাত ধরে যোগ দেন পাথর ব্যবসায়। আর তাতেই ভাগ্য খুলে যায় তাঁর।
বাইরে সাদামাটা, ভেতরে ‘যখের ধন’: মহম্মদবাজার থানা এলাকার ডেউচা বাস স্ট্যান্ডের ঠিক পাশেই মিনারের বাড়ি। বাইরে থেকে বাড়িটি বেশ বড় হলেও তার রঙচটা ও সাদামাটা চেহারার কারণে আলাদা করে কারও নজর কাড়ার কথা নয়। কিন্তু সেই সাধারণ বাড়ির অন্দরেই যে আলমারিতে এমন বিশাল ‘যখের ধন’ লুকিয়ে ছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কেউ।
অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে কী যোগ রয়েছে?
তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে বীরভূমে বালি ও পাথর পাচারের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। ‘ডিসিআর’ কেটে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব লুটের অভিযোগ তুলে বারবার সোচ্চার হয়েছে জেলা বিজেপি নেতৃত্ব।
বিজেপির দাবি, এই টুলু মণ্ডল একসময় সরাসরি অনুব্রত মণ্ডল (কেষ্ট) ঘনিষ্ঠ ছিলেন। গরু পাচার মামলায় তিহাড় জেলে বন্দি থাকতে হয়েছিল কেষ্টকে, আর সেই একই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দিল্লিতে তলব করা হয়েছিল টুলু মণ্ডলকেও।
সেই সূত্রে টুলুর ঘনিষ্ঠ শ্যালক মিনারও যে অনুব্রত শিবিরের খুব কাছের মানুষ ছিলেন, তা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে শাসক শিবির থেকে শুরু করে সর্বত্র। যদিও এই বিষয়ে কেষ্ট মণ্ডলের তরফে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ইতিমধ্যেই পুলিশ মিনার মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছে এবং তাঁর সম্পূর্ণ বাড়িটি সিল করে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। বাসচালক থেকে শুরু করে কোটিপতি হয়ে ওঠার এই চাঞ্চল্যকর কাহিনির তদন্তে পুলিশ এখন কোন কোন রাঘববোয়ালের নাগাল পায়, সেটাই দেখার!