৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম! ভরত তিওয়ারির এনকাউন্টার মামলায় মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর আশ্বাসের পর মোড় ঘুরল কোন রাজনীতির?

ভোজপুরের আলোচিত ভারত তিওয়ারির কথিত এনকাউন্টার মামলাকে কেন্দ্র করে বিহারের রাজনৈতিক অঙ্গন ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আসন্ন বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে মৃত ভারত তিওয়ারির পরিবার জন সুরজ (Jan Suraaj)-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোরের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছে। পরিবারের দাবি, ঘটনার পরপরই তাঁদের ন্যায়বিচারের কড়া আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উল্টো তাঁদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী এবং বিজেপি সাংসদ মনোজ তিওয়ারির সঙ্গে সাক্ষাতের পর ভরত তিওয়ারির পরিবার বর্তমান রাজ্য সরকারের ওপর আস্থা প্রকাশ করে দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা ব্যক্ত করেছে।
প্রশান্ত কিশোরের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতির খেলাপের অভিযোগ
ভারত তিওয়ারির ভাবি সুমন দেবী সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলে জানান, মর্মান্তিক ওই ঘটনার কিছুদিন পরেই তাঁদের প্রশান্ত কিশোরের বাসভবনে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে পরিবারের হাতে হাত রেখে কথা দেওয়া হয়েছিল যে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, অন্যথায় তাঁরা নিজেরাই প্রতিবাদ ও ঘেরাও আন্দোলন গড়ে তুলবেন। কিন্তু সুমনের অভিযোগ, নির্দিষ্ট সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রশান্ত কিশোর বা তাঁর দলের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি।
বরং এরপর বহুবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও পরিবারটির কোনো ফোন ধরা হয়নি এবং কোনো রকম সহযোগিতাও মেলেনি। সুমন দেবীর স্পষ্ট কথা, কেবল বড় বড় মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে কখনোই ন্যায়বিচার মেলে না, তার জন্য বাস্তবসম্মত কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন। পরিবারটি ভেবেছিল কথামতো কাজ হবে, কিন্তু দেড় মাসেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর হতাশা ছাড়া আর কিছুই জোটে নি।
রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহারের অভিযোগ ও মৌলিক সমস্যা
পরিবারের সদস্যদের আরও চাঞ্চল্যকর দাবি, এই মামলার সূত্রে তাঁদের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রচারে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। সুমন দেবীর মতে, তাঁদের স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে প্রচারে অংশ নিলে তবেই এই লড়াইয়ের ময়দান তৈরি হবে। কিন্তু একবাক্যেই তা খারিজ করে তিনি জানিয়েছেন যে, তাঁর পরিবার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ক্রীড়নক বা তল্পিবাহক হতে চায় না। তাঁদের একমাত্র এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ভরত তিওয়ারির মৃত্যুর সঠিক বিচার আদায় করা, কোনো নোংরা রাজনীতিতে জড়ানো নয়।
পাশাপাশি, ভরত যে সামাজিক ইস্যুগুলোর জন্য লড়াই চালাতেন, সেই প্রসঙ্গও তুলে ধরেন সুমন। তিনি জানান, তাঁর দেবর আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তিনি যে জনসমস্যাগুলির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন সেগুলি এখনও একইরকম রয়ে গেছে। আজও তাঁদের গ্রাম পাকা রাস্তাঘাট, জলনিকাশি ও তীব্র জলাবদ্ধতা এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে ধুঁকছে। একজন প্রতিবাদী যুবকের মৃত্যুর পরও যদি গ্রামের অবস্থার একচুলও পরিবর্তন না ঘটে, তবে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়।
মনোজ তিওয়ারি ও সম্রাট চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক এবং নতুন মোড়
সম্প্রতি ভরত তিওয়ারির পরিবার দিল্লি বা স্থানীয় স্তরে বিজেপি সাংসদ মনোজ তিওয়ারির সঙ্গেও সাক্ষাত করেছেন। সুমন দেবীর ভাষ্যমতে, বৈঠকে তাঁরা আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা বিশদে তুলে ধরেন। এমনকি মনোজ তিওয়ারি নিজেও স্বীকার করেন যে এই মামলার বহু খুঁটিনাটি তাঁর অজানা ছিল এবং প্রশাসন তাঁকে অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্য দিয়েছিল। নিজেদের বক্তব্য দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে পরিবারটি ঘটনায় জড়িত দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে।
এদিকে, এই বৈঠকের পরেই বিজেপির পক্ষ থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হলে তা নতুন করে রাজনৈতিক তরজাকে উসকে দেয়। তবে পরিবারটি আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁদের কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় সখ্যতা নেই। তাঁদের একমাত্র দাবি—ভারত তিওয়ারির মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তি এবং পরিবারের ন্যায্য পাওনা ন্যায়বিচার।
অন্যদিকে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে পরিবারটি। সুমন দেবী জানান, মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের কথা শুনেছেন এবং আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ইতিমধ্যে ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে এবং শোকস্তব্ধ পরিবারটি আশাবাদী যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই রাজ্য সরকার দোষীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
সবমিলিয়ে, ভারত তিওয়ারির কথিত এনকাউন্টার মামলাটি ইতিমধ্যেই বিহারের রাজনীতিতে অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে নানান সামাজিক সংগঠন এই ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছে। তবে পরিবারের এই নতুন এবং সরাসরি অভিযোগগুলো পুরো মামলাটিকে এক সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক মোড়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।