ভক্তদের জন্য নয়, এই পানীয় উৎসর্গ করা হয় অদৃশ্য আত্মাদের! রথযাত্রার এই প্রথা কেন জানেন?

ওড়িশার পুরীতে রথযাত্রা মানেই লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম। তবে এই মহা উৎসবের মাঝেও এমন কিছু প্রাচীন প্রথা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে আজও বিস্ময়ের। তেমনই এক অনন্য রীতির নাম ‘অধড় পানা’ (Adhara Pana)। শ্রীজগন্নাথ দেবের রথযাত্রায় প্রসাদ যেখানে অত্যন্ত পবিত্র ও প্রার্থিত বস্তু, সেখানে এই পানীয় কেন ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয় না, বরং মাটিতে ঢেলে দেওয়া হয়? এর পিছনে রয়েছে এক গভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক তত্ত্ব।
কী এই অধড় পানা?
অধড় পানা হলো একটি বিশেষ সুমিষ্ট পানীয়। দুধ, ছানা, চিনি, কর্পূর এবং সুগন্ধি মশলা দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। রথযাত্রার অন্তিম পর্যায়ে, যখন দেবতারা রথের ওপর অবস্থান করেন, তখন বিশেষ উচ্চতার বড় বড় মাটির পাত্রে এই পানীয় দেবতাকে উৎসর্গ করা হয়।
কেন এই পানীয় মাটিতে ঢেলে দেওয়া হয়?
পৌরাণিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অধড় পানা ভক্তদের জন্য নয়। রথযাত্রার সময় শ্রীজগন্নাথের সঙ্গে বহু অদৃশ্য আধ্যাত্মিক সত্তা, পথহারা আত্মা এবং অশরীরী শক্তি রথের পিছু পিছু চলে আসে। এই দেবতাদের যাত্রার সঙ্গী অশরীরীদের তৃষ্ণা মেটানো এবং তাদের মোক্ষ ও শান্তি প্রদানের জন্যই এই বিশেষ প্রসাদের আয়োজন। পানীয়টি মাটির পাত্রে উৎসর্গ করার পর তা রথের ওপর ভেঙে দেওয়া হয়, যাতে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেই অশরীরী আত্মা ও শক্তিরা তা গ্রহণ করতে পারে।
মানুষের জন্য কেন নিষিদ্ধ?
এই প্রথাটি মানুষের কাছে পৌঁছায় না, কারণ এটি বিশেষভাবে সেই অদৃশ্য সত্তাদের জন্য উৎসর্গীকৃত। রথযাত্রার ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী, এই পানীয় না তো প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়, না তা কোনো মানুষ পান করতে বা স্পর্শ করতে পারেন। এটি কেবল দেবতাদের করুণার এক বহিঃপ্রকাশ, যা মহাবিশ্বের প্রতিটি সত্তার প্রতি জগন্নাথ দেবের অসীম মমতাকে তুলে ধরে।
মাটির পাত্র ভাঙার তাৎপর্য:
অধড় পানা প্রসাদ অর্পণের পর মাটির পাত্র ভেঙে ফেলার মধ্যেও রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন। হিন্দু দর্শনে মাটির পাত্রকে মানবদেহের নশ্বরতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। যেমন পাত্রটি ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে যায়, তেমনি জীবনও নশ্বর। এই প্রথাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্ব এবং আত্মার অবিনশ্বরতার কথা।
কবে পালিত হয় এই রীতি?
রথযাত্রার শুরুতে এই অনুষ্ঠান হয় না। উল্টোরথ বা বাহুড়া যাত্রার পর এবং নীলাদ্রি বিজয়ের ঠিক আগে, অর্থাৎ দ্বাদশী তিথিতে দেবতাদের রথের ওপর থাকাকালীন এই শেষ রীতির আয়োজন করা হয়।
জগন্নাথ সংস্কৃতিতে ‘অধড় পানা’ কেবল একটি আচার নয়, এটি মানুষের বিশ্বাসকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়েও এই প্রথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শ্রীজগন্নাথ শুধু মানুষের ভগবান নন, তিনি এই মহাবিশ্বের প্রতিটি অদৃশ্য প্রাণের রক্ষাকর্তা।