“বইয়ের বোঝা নয়, মানুষ গড়ার পাঠশালা!”-জেনেনিন কী কী রয়েছে সোনমের সেই স্কুলে?

লেহ থেকে ১৬ কিমি দূরে পাহাড়ের খাঁজে অবস্থিত ‘ফে’ (Phey) গ্রাম। ১১,৫০০ ফুট উচ্চতায় কনকনে ঠান্ডা আর রুক্ষ পরিবেশে সেখানে গড়ে উঠেছে এক অভিনব শিক্ষাঙ্গন—SECMOL (Students’ Educational and Cultural Movement of Ladakh)। এটি কোনো সাধারণ স্কুল নয়, বরং সোনম ওয়াংচুকের স্বপ্নের এক ‘মানুষ তৈরির পাঠশালা’।
শিক্ষকতা নয়, এখানে সবাই মেন্টর প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় যেখানে র্যাঙ্ক বা মুখস্থবিদ্যার লড়াই চলে, সোনমের স্কুল সেখানে শেখায় ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’। এখানে ছাত্রছাত্রীরাই ক্যাম্পাসের প্রশাসন, রান্নাঘর থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নেয়। শিক্ষকরা এখানে কোনো গুরু নন, বরং মেন্টর। প্রচলিত শিক্ষায় যারা ‘ফেল’ করেছে, তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই এই স্কুলের মূল লক্ষ্য। এখানে ভুল করলে বকুনি নেই, বরং ব্যর্থতাকে জয় করার শিক্ষা দেওয়া হয়।
পরিবেশই যখন বন্ধু গোটা ক্যাম্পাসটি পুরোপুরি সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীল। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এখানে নেই বললেই চলে। স্কুলে রয়েছে ‘আইস টাওয়ার’, যা শীতকালে জল ধরে রাখার এক অভাবনীয় প্রযুক্তি। আইস স্কেটিং থেকে শুরু করে কৃষিকাজ, নির্মাণকাজ এবং আঞ্চলিক খাবার (যেমন—কিমচি বা লাদাখি আচার) তৈরির মতো বাস্তব জীবনের প্রতিটি দক্ষতা এখানে শেখানো হয়।
কেমন এই স্কুলের জীবন?
-
যোগ্যতা: লেহ, কার্গিল, জাংস্কার ও পাদ্দার থেকে আসা শিক্ষার্থীরা এখানে পড়ে। একমাত্র শর্ত হলো লাদাখি ভাষায় যোগাযোগে সক্ষম হতে হবে।
-
দৈনন্দিন দায়িত্ব: গবাদি পশুর যত্ন, বাগান করা, দোকান চালানো এবং ফি সংগ্রহের মতো দায়িত্ব সামলায় পড়ুয়ারাই।
-
সাংস্কৃতিক পরিবেশ: খেলাধুলার পাশাপাশি বিতর্ক, কুইজ এবং বিভিন্ন ভাষার সিনেমা দেখানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করা হয়।
সোনম ওয়াংচুক ও ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর ভ্রান্তি অনেকেই মনে করেন, আমির খানের ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর ব়্যাঞ্চো চরিত্রটি সোনম ওয়াংচুকের আদলে তৈরি এবং সিনেমাটির স্কুলটিই SECMOL। যদিও সোনম নিজেই জানিয়েছেন, সিনেমার শুটিং অন্য স্কুলে হয়েছে এবং আমির খানও জানিয়েছেন, ব়্যাঞ্চো চরিত্রটি হুবহু সোনমের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত নয়। তবে বিতর্ক যাই থাক, লাদাখ ভ্রমণে গেলে পরিবেশ ও শিক্ষাকে মিশিয়ে গড়ে তোলা এই অনন্য ক্যাম্পাসের দর্শন পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ পাওনা।
পরীক্ষার খাতার বাইরের এক অন্য জগত, যেখানে প্রকৃতিই প্রধান শিক্ষক এবং স্বনির্ভরতাই জীবনের মূল মন্ত্র—সোনম ওয়াংচুকের এই স্কুল আজও এক জ্বলন্ত উদাহরণ।