বর্ষা নামতেই ওত পেতে আছে নতুন ‘অ্যাডেনোভাইরাস’! শিশুদের থালায় এই ৭টি খাবার দিলেই ঘটবে মারাত্মক বিপদ

বর্ষার আগমনে চারিদিকের আবহাওয়া ঠান্ডা ও মনোরম হলেও, এই মরসুমটি শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য চরম উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে এই সময়ে ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক মারাত্মক দ্রুত গতিতে বংশবিস্তার করে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ঘরের ছোট সদস্যদের ওপর। যেহেতু শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity System) প্রাপ্তবয়স্কদের মতো পুরোপুরি বিকশিত হয় না, তাই বর্ষা আসতেই ডায়রিয়া, বমি, তীব্র পেটের সংক্রমণ এবং ফুড পয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি এক ধাক্কায় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই মরসুমে শিশুদের মধ্যে রোটাভাইরাস ও নোরোভাইরাসের সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি দেখা যায়। দূষিত জল, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বাসি খাবারই এই ভাইরাসগুলো ছড়ানোর মূল উৎস। এর পাশাপাশি চিকিৎসকদের নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হিউম্যান অ্যাডিনোভাইরাস-এফ’ (Human Adenovirus-F)। বিশেষ করে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা এই নতুন ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সন্তানদের সুস্থ রাখতে বিশেষজ্ঞরা ৭টি খাবার শিশুদের থালা থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন:
১. রাস্তার কাটা ফল ও খোলা শরবত
ফুটপাতে কেটে রাখা ফল কিংবা খোলা অবস্থায় বিক্রি হওয়া কৃত্রিম রঙের শরবত বর্ষাকালে জীবাণুর আঁতুড়ঘর। এগুলোতে সহজেই ‘ই-কোলাই’ ও ‘সালমোনেল্লা’র মতো ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া বাসা বাঁধে। যা থেকে শিশুদের খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি টাইফয়েড বা জন্ডিসের মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে।
করণীয়: বাজার থেকে আনা ফল ভালো করে ধুয়ে কিছুক্ষণ নুন-জলে ভিজিয়ে রাখুন। বাচ্চার স্কুলের টিফিনে কাটা ফলের বদলে আস্ত ফল (যেমন- কলা বা গোটা আপেল) দিন।
২. অর্ধসিদ্ধ ডিম বা মাংস
বর্ষার আর্দ্রতায় হাঁস-মুরগির ডিম ও মাংসে সালমোনেল্লা ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ খুব সাধারণ বিষয়। তাই এই সময়ে হাফ-বয়েল ডিম, কম রান্না করা কষা মাংস কিংবা দোকান থেকে কেনা ফ্রোজেন ও প্রক্রিয়াজাত মিট শিশুদের একেবারেই দেবেন না। যেকোনো ডিম বা মাংস উচ্চতাপে খুব ভালো করে সেদ্ধ করে তবেই খাওয়ান।
৩. সামুদ্রিক মাছ ও সি-ফুড
চিংড়ি, কাঁকড়া বা অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ বর্ষার মরসুমে খুব দ্রুত ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা দূষিত হয়। এছাড়া এই সময়ে কিছু সামুদ্রিক মাছে প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষতিকর টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদান জমার ঝুঁকি থাকে, যা শিশুদের পেটে গেলে মারাত্মক ফুড পয়জনিং হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ফ্রিজে রাখা সামুদ্রিক মাছ এড়িয়ে চলে, নদী বা পুকুরের টাটকা দেশি ছোট মাছ বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
৪. কাঁচা সালাদ ও পাতাজাতীয় সবজি
বর্ষাকালে বাঁধাকপি, লেটুস পাতা কিংবা পালংশাকের মতো পাতাজাতীয় সবজিতে বিভিন্ন পরজীবী, ছত্রাক বা ফিতাকৃমির ডিম লুকিয়ে থাকে। সাধারণ ঠান্ডা জল দিয়ে ধুলে এগুলো কখনোই পুরোপুরি পরিষ্কার হয় না। তাই শিশুদের কাঁচা সালাদ দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করুন। সালাদের বিকল্প হিসেবে সবজি ভালো করে নুন-গরম জলে ধুয়ে তা দিয়ে স্যুপ বা স্ট্যু বানিয়ে দিন।
৫. প্যাকেটজাত ও আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড
চিপস, নাচোস, কুকিজ, চকোলেটের পাশাপাশি সসেজ, হটডগ বা সালামির মতো প্রক্রিয়াজাত মাংস এই স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় শিশুদের হজমশক্তি একবারে নষ্ট করে দেয়। এগুলো পেটের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। এর বদলে শিশুকে ঘরে তৈরি ওটস, ডালিয়া, কিনোয়া বা চিঁড়ের তৈরি মুখরোচক ও স্বাস্থ্যকর খাবার দিন।
৬. কার্বোনেটেড কোমল পানীয় (Cold Drinks)
গ্যাসযুক্ত বা কার্বোনেটেড কোল্ড ড্রিংকসে থাকে অতিরিক্ত চিনি এবং কৃত্রিম উপাদান, যা শিশুদের পাকস্থলীর স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও হজমপ্রক্রিয়া ব্যাহত করে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও দুর্বল করে দেয়। বর্ষায় কোমল পানীয়ের বদলে শিশুকে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ জল, ডাবের জল কিংবা বাড়িতে তৈরি ফলের টাটকা রস দিন।
৭. ফ্রিজে রাখা ২৪ ঘণ্টার পুরোনো খাবার
ফ্রিজে রাখা বাসি ভাত, ডাল, তরকারি, পাউরুটি বা কেক এই মরসুমে শিশুদের খাওয়ানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। ফ্রিজ থেকে বের করার পর খাবার যখন স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আসে, তখন তাতে খুব দ্রুত ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি ঘটে। ফলে বাসি খাবার গরম করে খাওয়ালেও বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই শিশুদের সবসময় টাটকা রান্না করা গরম খাবার খাওয়ান।
পাবলিক হেলথ গাইডলাইন: সুস্থতার ৪টি সোনালী নিয়ম
১. শিশুকে সর্বদা ফুটিয়ে ঠান্ডা করা বিশুদ্ধ ও নিরাপদ জল পান করান।
২. খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধোওয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করুন।
৩. রান্নাঘর সর্বদা শুষ্ক ও পরিষ্কার রাখুন এবং সমস্ত খাবার শক্ত ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখুন।
৪. বাইরে থেকে কেনা খোলা খাবার বা রাস্তার ফাস্টফুড খেতে শিশুদের কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করুন।