পাসপোর্ট থাকলেই কি আপনি ভারতীয়? কেন্দ্র সরকারের নতুন ঘোষণায় দানা বাঁধল প্রবল সংশয়

পাসপোর্ট মানেই ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত সিলমোহর—এতদিন এমনটাই জেনে এসেছে দেশবাসী। কিন্তু সম্প্রতি বিদেশ মন্ত্রকের অধীনস্থ ‘পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্র’র এক ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। সরকারি আধিকারিকদের দাবি, “পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, এটি কেবলমাত্র একটি ভ্রমণ সংক্রান্ত নথি (Travel Document)।” কেন্দ্রের এই নতুন অবস্থানে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের বৈধ নথি কোনটি?
বিতর্কের সূত্রপাত কোথায়? পাসপোর্ট আইন, ১৯৬৭ অনুযায়ী, একমাত্র ভারতীয় নাগরিকরাই পাসপোর্টের অধিকারী হতে পারেন। অর্থাৎ, পাসপোর্ট পাওয়া মানেই তিনি ভারতীয় নাগরিক—এই ছিল প্রচলিত ধারণা। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নির্বাচন কমিশনও ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য পাসপোর্টকে বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করে আসছে। এমতাবস্থায়, বিদেশ মন্ত্রকের এই নতুন ব্যাখ্যা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
জাতীয়তা বনাম নাগরিকত্ব: সরকারি যুক্তি কী? সরকারি আধিকারিকদের মতে, ‘জাতীয়তা’ (Nationality) এবং ‘নাগরিকত্ব’ (Citizenship) আলাদা বিষয়। তাদের ব্যাখ্যা:
-
জাতীয়তা: এটি সাধারণত জন্মগত বা ভৌগোলিক পরিচয়।
-
নাগরিকত্ব: এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির এক আইনি ও রাজনৈতিক বন্ধন। সরকারের মতে, পাসপোর্ট দেওয়ার সময় পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয় ঠিকই, কিন্তু নাগরিকত্ব নির্ধারণ একটি জটিল আইনি প্রক্রিয়া, যা কোনো একটি নথির ওপর নির্ভর করে না। জন্ম সনদ বা বার্থ সার্টিফিকেটকে এই ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো নথির তুলনায় বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিরোধীদের কড়া সমালোচনা কেন্দ্রের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন বিরোধী নেতারা।
-
সুপ্রিয়া শ্রীনাতে (কংগ্রেস): তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আধার, প্যান, ভোটার আইডি কিংবা পাসপোর্ট—কোনোটিই যদি নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়, তবে ভারতবাসীকে ঠিক কোন নথি নিয়ে গর্ব করতে হবে? এটি কি তবে কেবল বিজেপির পরিচয়পত্র বা আরএসএস-এর টুপিই নাগরিকত্বের একমাত্র পরিচয় হতে চলেছে?
-
সৌগত রায় (তৃণমূল): তিনি সরকারের কাছে এই বিভ্রান্তি দ্রুত স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন।
-
আসাদুদ্দিন ওয়েইসি (AIMIM): তাঁর মতে, এই অবস্থান অত্যন্ত উদ্বেগের এবং এটি মানুষকে বিভ্রান্ত করার একটি কৌশল।
এনআরসি-র পুরনো প্রসঙ্গ কি ফিরে আসছে? এই জটিলতার মধ্যেই আবার চাউর হয়েছে যে, এই কারণেই সম্ভবত জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি (NRC) কার্যকর করার কথা আগে ভাবা হয়েছিল। যদিও প্রধানমন্ত্রী নিজে জানিয়েছেন গোটা দেশে এনআরসি করার কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি।
এখন দেখার বিষয়, সরকার এই বিতর্কিত মন্তব্যের পর দেশবাসীকে নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে সঠিক দিশা দেখাতে পারে কি না। নথিপত্রের এই গোলকধাঁধায় সাধারণ মানুষের মনে যে প্রশ্ন জেগেছে, তার উত্তর দেওয়া এখন কেন্দ্রের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।