কানহায় বাঘেদের ওপর ‘যমদূত’ হয়ে নেমে এলো কোন ভাইরাস? মাত্র ৬০ দিনে ৭টি বাঘের মৃত্যুতে তোলপাড় বন্যপ্রাণী মহল!

ভারতের অন্যতম বিখ্যাত এবং প্রথম সারির বাঘ সংরক্ষণাগার, মধ্যপ্রদেশের ‘কানহা টাইগার রিজার্ভ’ (Kanha Tiger Reserve)-এ এই মুহূর্তে নেমে এসেছে এক চরম অন্ধকার ছায়া। বনের রাজাদের ওপর যেন ‘যমদূত’ হয়ে চেপে বসেছে এক মারণ ভাইরাস। কানহায় কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না বাঘের মৃত্যুমিছিল। এবার মুক্কি কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারাল আরও একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘ। আর এই নিয়ে গত মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে কানহা অবয়ারণ্যে মারণ ভাইরাসের থাবায় প্রাণ গেল মোট ৭টি বাঘের!
বন দপ্তর ও চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে এই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মৃত্যুর পর, কানহার বন্যপ্রাণী সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং ব্যাঘ্র সংরক্ষণ নিয়ে দেশজুড়ে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া হয়ে গেছে।
হাতি টহল দলের তৎপরতাতেও বাঁচানো গেল না প্রাণ
বন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ঠা জুন, ২০২৬ তারিখে কানহা টাইগার রিজার্ভের কিসলি রেঞ্জের ৭৭৭ নম্বর কম্পার্টমেন্টের সান্দুক খোল এলাকায় একটি বাঘকে অত্যন্ত দুর্বল ও অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। একটি হাতির টহল দল (Elephant Patrolling Team) প্রথম বিষয়টি লক্ষ্য করে বন বিভাগকে খবর দেয়। দ্রুত ট্রাঙ্কুলাইজ করে বাঘটিকে উদ্ধার করে মুক্কির বিশেষ কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে নিয়ে আসা হয়েছিল।
সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে যে বাঘটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ‘ক্যানাইন ডিসটেম্পার ভাইরাস’ (Canine Distemper Virus – CDV)-এ আক্রান্ত। নানাজি দেশমুখ ভেটেরিনারি অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি এবং ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন ট্রাস্ট (WCT)-এর শীর্ষ বিশেষজ্ঞরা দিনরাত এক করে বাঘটির চিকিৎসা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু ক্রমাগত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও কড়া ডোজের ওষুধ সত্ত্বেও বাঘটির অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি এবং গত মঙ্গলবার সেটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
মাত্র ৯ দিনে শেষ মা ও ৪ সন্তানের পুরো পরিবার!
কানহা টাইগার রিজার্ভে এই সিডিভি (CDV) ভাইরাসের প্রথম মারাত্মক রূপ দেখা গিয়েছিল সারহি রেঞ্জে। গত ২১শে এপ্রিল আমাহি এলাকা থেকে বাঘিনী ‘টি-১৪১’-এর চারটি শাবকের মধ্যে একটির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এর ঠিক ৩ দিনের মাথায় ২৪ ও ২৫শে এপ্রিল মারা যায় আরও দুটি শাবক।
পরপর ছানার মৃত্যুতে নড়েচড়ে বসে বন বিভাগ। সংক্রমণ রুখতে বাঘিনী ও তার একমাত্র বেঁচে থাকা শেষ শাবকটিকে উদ্ধার করে মুক্কি কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে পাঠানো হয়। কিন্তু এই ভাইরাস এতটাই মারাত্মক যে, ২৯শে এপ্রিল প্রথমে বাঘিনীটি মারা যায় এবং তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ ছানাটিও ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। অর্থাৎ, মাত্র ৯ দিনের মধ্যে একটি বাঘিনী এবং তার ৪টি সন্তানের পুরো পরিবারটি জঙ্গল থেকে চিরতরে মুছে যায়!
বিখ্যাত ‘মহাবীর’-ও হেরে গিয়েছিল এই ভাইরাসের কাছে
এই ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ হয়নি। গত ১৯শে মে মুক্কি রেঞ্জের পর্যটকদের অত্যন্ত প্রিয় এবং বিখ্যাত বাঘ ‘মহাবীর’ আচমকা মারা যায়। পরবর্তীতে ফরেনসিক ও ল্যাব তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, মহাবীরের মৃত্যুর নেপথ্যেও ছিল এই অভিশপ্ত ক্যানাইন ডিসটেম্পার ভাইরাস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাস মূলত মাংসাশী বন্যপ্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বসনতন্ত্রকে সম্পূর্ণ অকেজো করে দেয়, যা বন্যপ্রাণীদের জন্য অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও বিপজ্জনক। এর বিস্তার রোধ করতে আক্রান্ত এলাকাগুলিতে ২৪ ঘণ্টা ড্রোন ও ক্যামেরা নজরদারি এবং সময়মতো আক্রান্ত পশুকে আইসোলেট করা জরুরি। বর্তমানে কানহা কর্তৃপক্ষ পুরো বনাঞ্চলে হাই-অ্যালার্ট জারি করেছে এবং কড়া নজরদারি অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু যেভাবে একের পর এক বাঘের মৃত্যু হচ্ছে, তাতে উদ্বিগ্ন দিল্লির ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষও (NTCA)।