আকাশ ছোঁয়া উচ্চতা থেকে ৩০% ধস! ২০২৬-এ ইন্ডিগোর ডানায় কেন লাগল লোকসানের মরণকামড়?

ভারতের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহন সংস্থা ইন্ডিগো (IndiGo)-র জন্য ২০২৬ সালটি যেন এক চরম অগ্নিপরীক্ষার বছর হয়ে দাঁড়িয়েছে। একের পর এক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতার ঝড়ে রীতিমতো টালমাটাল অবস্থা এই এভিয়েশন জায়ান্টের। একদিকে দেশের নতুন শুল্ক বিধির জেরে তীব্র পাইলট সংকট ও পরিচালনগত বিপর্যয়, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আকাশছোঁয়া জ্বালানি খরচ— এই জোড়া ফলায় বিদ্ধ হয়ে ইন্ডিগোর আর্থিক পারফরম্যান্স ও শেয়ার গ্রাফে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন ধস। গত এক বছরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এতটাই দুর্বল হয়েছে যে, সংস্থার শেয়ার তার রেকর্ড সর্বোচ্চ স্তর থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ নিচে নেমে গেছে।
নতুন ‘এফডিটিএল’ বিধি ও পাইলট সংকট:
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল এভিয়েশন (DGCA) কর্তৃক নতুন ‘ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশন’ (FDTL) বিধিমালা কার্যকর করার পর থেকেই মূলত ইন্ডিগোর সংকটের সূত্রপাত। পাইলট এবং ক্রু মেম্বারদের ক্লান্তি দূর করতে এবং সুরক্ষার স্বার্থে কাজের সময়সূচিতে এই কড়া পরিবর্তন আনা হয়। কিন্তু এর ফলে বিমান সংস্থাটির জন্য রাতারাতি দক্ষ পাইলটের চরম প্রাপ্যতা সংকট তৈরি হয়। ক্রু শিডিউলিংয়ের এই বড়সড় ওলটপালটের জেরে বেশ কয়েকটি রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা যাত্রীদের চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং এয়ারলাইন্সের দৈনিক কার্যকারিতাকে পঙ্গু করে দেয়।
ব্যয় বাড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ:
ইন্ডিগো যখন এই অভ্যন্তরীণ ক্রাইসিস সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইজরায়েল-ইরান সংঘাত এবং তাতে আমেরিকার সরাসরি সম্পৃক্ততা গোটা বিশ্বের বিমান চলাচল ক্ষেত্রের সমীকরণ বদলে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনার কারণে বহু দেশ তাদের আকাশসীমা (Airspace) বন্ধ বা আংশিক বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে আন্তর্জাতিক রুটে ইন্ডিগোর বিমানগুলিকে দীর্ঘ পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এই দীর্ঘ পথ সরাসরি বিমানের এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল (ATF) বা জ্বালানি খরচ এবং সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তার ওপর হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও আকাশছোঁয়া। যেহেতু যেকোনো বিমান সংস্থার মোট খরচের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশই চলে যায় জ্বালানির পেছনে, তাই এই বর্ধিত ব্যয় ইন্ডিগোর মুনাফায় বড়সড় কোপ মেরেছে।
মুনাফায় আড়াই হাজার কোটির ধস, মাথায় হাত বিনিয়োগকারীদের:
এই সমস্ত বহুমাত্রিক ঝুঁকির পূর্বাভাস পেয়ে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীরা ইন্ডিগোর শেয়ার ব্যাপক হারে বিক্রি করতে শুরু করেছেন। ফলস্বরূপ, গত ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ছুঁয়ে যাওয়া রেকর্ড সর্বোচ্চ ৬,২৩২ টাকা থেকে কোম্পানিটির স্টক প্রাইস এক ধাক্কায় প্রায় ৩০% হ্রাস পেয়েছে। শুধু গত ছয় মাসেই শেয়ারের দর পড়েছে প্রায় ২০%।
আর্থিক ফলাফলের দিকে তাকালে এই ক্ষত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ অর্থবর্ষের চতুর্থ ত্রৈমাসিকে ইন্ডিগো যেখানে ২,৫৩৬ কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ নিট লোকসান (Net Loss) দেখিয়েছে, সেখানে ঠিক এক বছর আগে একই সময়ে সংস্থাটি ৩,০৬৭ কোটি টাকা নিট লাভ করেছিল। যদিও এই মন্দার মধ্যেও পরিচালন আয় ১% বৃদ্ধি পেয়ে ২২,৪৩৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
১০০ বিলিয়নের তহবিল: মিলবে কি স্বস্তি?
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্ডিগোর ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দর এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করছে। তবে এই চরম সংকটের মুহূর্তে বিমান সংস্থাগুলিকে কিছুটা স্বস্তি দিতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। বিমান সংস্থাগুলির জ্বালানি তেলের চরম মূল্য ওঠানামা থেকে সুরক্ষা দিতে কেন্দ্র সরকার ১০০ বিলিয়ন রুপির একটি ‘এটিএফ মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল’ (ATF Price Stabilization Fund) অনুমোদন করেছে। এই সরকারি লাইফলাইনের ফলে তেলের দাম যদি কিছুটা স্থিতিশীল হয়, তবেই ইন্ডিগো আগামী দিনে ঘুরে দাঁড়ানোর অক্সিজেন পেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে পরিচালন ও ব্যয়— দুই ফ্রন্টেই ইন্ডিগোর এই মরণকামড় লড়াইয়ের দিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে দাল্লাল স্ট্রিট।
দাবিত্যাগ: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে পরিবেশন করা হলো। এটিকে কোনো প্রকার বিনিয়োগের পরামর্শ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। যেকোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সর্বদা প্রত্যয়িত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।