ক্লাসের জটিল অঙ্ক মেলালেও জীবনের অঙ্ক মিলল না! বরেলিতে তরুণ গণিত শিক্ষকের আত্মহত্যার নেপথ্যে কোন রহস্য?

ক্লাসরুমে ব্ল্যাকবোর্ডের কঠিন থেকে কঠিনতর গণিতের সমাধান নিমেষের মধ্যে করে দিতেন ২৬ বছরের তরুণ শিক্ষক। কিন্তু বাস্তব জীবনের এক জটিল অঙ্কের গোলকধাঁধায় পড়ে শেষমেশ আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হলো তাঁকে। উত্তর প্রদেশের বরেলি থেকে সামনে এসেছে এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা। প্রেমঘটিত বিবাদ, প্রেমিকার পরিবারের তরফ থেকে লাগাতার হুমকি এবং মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন এক সরকারি স্কুলের গণিত শিক্ষক।
ঘটনাটি ঘটেছে বরেলির ইজ্জতনগর থানার অন্তর্গত ধৌরেরা মাফি গ্রামে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ওই শিক্ষকের লেখা চার পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে, যা এই মৃত্যুর পেছনে এক ভয়ঙ্কর প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফোন না ধরায় সন্দেহ, ঘরে মিলল ঝুলন্ত দেহ
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মৃত শিক্ষকের নাম বশিষ্ট মুনি (২৬)। তিনি মূলত গোরখপুরের গোলা থানা এলাকার সুরজ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। বরেলির নবাবগঞ্জের বারৌর সরকারি ইন্টার কলেজে গণিতের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকার কারণে তিনি ইজ্জতনগরের ধৌরেরা মাফিতে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন।
গত শুক্রবার বশিষ্ট মুনির বাবা তাঁকে বারবার ফোন করলেও ওপার থেকে কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি। দীর্ঘক্ষণ কোনো যোগাযোগ করতে না পেরে চিন্তিত বাবা শেষমেশ বাড়িওয়ালাকে বিষয়টি জানান। বাড়িওয়ালা ঘরের কাছে গিয়ে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান এবং জানলা দিয়ে উঁকি মারতেই দেখেন, ঘরের ভেতর বশিষ্ট মুনির মরদেহ ফাঁসিতে ঝুলছে। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ইজ্জতনগর থানার পুলিশ এবং ফরেনসিক দল। পুলিশ রাতেই ময়নাতদন্ত শেষ করে শিক্ষকের মরদেহটি তাঁর শোকস্তব্ধ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে।
৪ পৃষ্ঠার সুইসাইড নোট এবং প্রেমিকার ব্ল্যাকমেইল
তদন্তে নেমে পুলিশের হাতে এসেছে বশিষ্ট মুনির লেখা চার পৃষ্ঠার একটি সুইসাইড নোট। সেখানে তিনি নিজের মৃত্যুর জন্য সরাসরি তাঁর প্রেমিকা এবং প্রেমিকার ভাইদের দায়ী করেছেন। সুইসাইড নোটে শিক্ষক লিখেছেন যে, তাঁর প্রেমিকা এবং তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে নির্যাতন ও হয়রানি করছিল। শুধু তাই নয়, তাঁর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছিল এবং টাকা না দিলে তাঁকে একটি ভুয়ো ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ক্রমাগত হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এই চরম সম্মানহানি ও আইনি জটিলতার ভয়ে তিনি তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন।
মোবাইল চ্যাট ও কল রেকর্ড খতিয়ে দেখছে পুলিশ
ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ বশিষ্ট মুনির মোবাইল ফোনটি বাজেয়াপ্ত করেছে। প্রাথমিক কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) এবং চ্যাট হিস্ট্রি ঘেঁটে দেখা গেছে, মৃত্যুর ঠিক আগে এবং গত কয়েকদিনে প্রেমিকার ফোন থেকে অসংখ্য কল এবং মেসেজ এসেছিল শিক্ষকের মোবাইলে। দুজনের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের বিবাদ এবং মানসিক টানাপোড়েন চলছিল, তা এই কল রেকর্ড থেকে স্পষ্ট।
বরেলি পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “আমরা চার পাতার সুইসাইড নোট, মোবাইল চ্যাট এবং কল রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে পুরো ঘটনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করেছি। ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। সুইসাইড নোটে যাদের নাম রয়েছে, তাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” এক মেধাবী শিক্ষকের এমন অকাল পরিণতিতে গোটা এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।