খোদ প্রধান বিচারপতির মুখে ‘আরশোলা’ শব্দ! বিচারব্যবস্থার নজিরবিহীন আক্রমণে তোলপাড় দেশের আইনি মহল

“সমাজে কিছু কিছু যুবক আছে যারা আরশোলার মতো! কোথাও কোনও কাজ পায় না, পেশাতেও কোনও জায়গা তৈরি করতে পারে না। তারপর রাতারাতি মিডিয়া পার্সন, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার কিংবা আরটিআই (RTI) অ্যাক্টিভিস্ট সেজে বসে এবং চারদিকের ব্যবস্থার ওপর অনবরত বিষোদ্গার করতে শুরু করে।”— দেশের বিচারব্যবস্থা এবং সুপ্রিম কোর্টের ওপর লাগাতার সোশ্যাল মিডিয়া আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে আজ এমনই এক নজিরবিহীন এবং বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। সমাজের একাংশকে সরাসরি ‘পরজীবী’ ও ‘আরশোলা’র সঙ্গে তুলনা করে প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য ঘিরে এই মুহূর্তে তোলপাড় গোটা দেশ।

শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে এক মামলার শুনানি চলাকালীন এই বেনজির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সঞ্জয় দুবে নামের এক আইনজীবী নিজেকে ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ বা প্রবীণ আইনজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে একটি অবমাননার মামলা দায়ের করেছিলেন। সেই মামলার শুনানিতেই ওই আইনজীবীর অতীত ফেসবুক পোস্ট এবং পেশাগত আচরণ দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিচারপতিরা।

“গোটা দুনিয়া সুযোগ পেলেও আপনি পাবেন না!”

শুনানি চলাকালীন ক্ষুব্ধ প্রধান বিচারপতি মামলাকারী আইনজীবীকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, “গোটা পৃথিবীর মানুষ এলিজিবল হলেও, সিনিয়র তকমা পাওয়ার যোগ্যতা অন্তত আপনার নেই। যদি দিল্লি হাইকোর্টও আপনাকে এই স্বীকৃতি দিয়ে দেয়, সুপ্রিম কোর্ট তা খারিজ করে দেবে।” বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, “সিনিয়র অ্যাডভোকেট তকমাটা আদালত সম্মান জানিয়ে কাউকে দেয়, মামলা করে ওটা আদায় করা যায় না। আপনি যেভাবে ওটার পেছনে তাড়া করছেন, তা কি একজন আইনজীবীর পক্ষে শোভা পায়?”

ভুয়ো আইন ডিগ্রি নিয়ে সিবিআই তদন্তের হুঁশিয়ারি!

এখানেই শেষ নয়, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইউটিউবে বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে কুরুচিকর প্রচার চালানো স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞদের কড়া দাওয়াই দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। আইনজীবী মহলের একাংশের জাল বা ভুয়ো ডিগ্রি নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “কালো কোট পরে ঘুরে বেড়ানো হাজার হাজার মানুষের আইন ডিগ্রির সত্যতা নিয়ে আমার ঘোর সন্দেহ রয়েছে। ফেসবুক বা ইউটিউবে এরা যেভাবে পোস্ট করছে, তারা কি ভাবছে সুপ্রিম কোর্ট অন্ধ? আমরা সব লক্ষ্য রাখছি।”

প্রধান বিচারপতি আরও জানান, তিনি এমন একটি সঠিক মামলার অপেক্ষায় আছেন, যেখানে নির্দেশ দিয়ে দিল্লির আইনজীবীদের ডিগ্রির সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব সরাসরি সিবিআই-এর (CBI) হাতে তুলে দেওয়া যায়। এই বিষয়ে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়াকে (BCI) তোপ দেগে তিনি বলেন, “বার কাউন্সিল এই ভুয়ো ডিগ্রিধারীদের বিরুদ্ধে কোনও দিন অ্যাকশন নেবে না, কারণ ভোটে জেতার জন্য ওদের এই কালো কোটধারী জালিয়াতদের ভোট প্রয়োজন হয়।”

আদালতের এই রণংদেহী মেজাজ দেখে শেষ পর্যন্ত কোণঠাসা হয়ে পড়েন মামলাকারী আইনজীবী। এজলাসেই নিজের আচরণের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়ার আর্জি জানান তিনি। সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি প্রত্যাহারের অনুমতি দিলেও, দেশের শীর্ষ আদালতের প্রধানের মুখ থেকে ‘আরশোলা’ বা ‘পরজীবী’র মতো কড়া বিশেষণ প্রয়োগ করার ঘটনা আইনি এবং সামাজিক মহলে এক মস্ত বড় বিতর্ক উস্কে দিল।