হায়দরাবাদের ‘ভিসা মন্দিরে’ মার্কিন সিনেটরের নজর! ভারতীয় আইটি কর্মীদের ‘সিন্ডিকেট’ বলে চরম তোপ আমেরিকার

ভারতের আইটি হাব হায়দরাবাদের বিখ্যাত চিলকুর বালাজি মন্দির, যা আমজনতার কাছে ‘ভিসা টেম্পল’ বা ভিসা মন্দির নামেই বেশি পরিচিত, তা এবার আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রভাবশালী সিনেটরের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। আমেরিকার অত্যন্ত জনপ্রিয় H-1B ভিসা কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করতে গিয়ে সরাসরি হায়দরাবাদের এই মন্দিরটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর এরিক শ্মিট। তাঁর দাবি, এই মন্দিরটি আসলে একটি আন্তর্জাতিক ‘ভিসা সিন্ডিকেট’-এর প্রতীক, যা আমেরিকানদের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে।

‘ভিসা সিন্ডিকেট’-এর নিজস্ব মন্দির! বিস্ফোরক মার্কিন সিনেটর
গত ১৩ মে, ২০২৬ তারিখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ চিলকুর বালাজি মন্দিরের একটি ছবি শেয়ার করে মার্কিন সিনেটর এরিক শ্মিট লেখেন, “এই ‘ভিসা সিন্ডিকেট’-এর হায়দরাবাদে নিজস্ব একটি ভিসা মন্দির রয়েছে। যেখানে হাজার হাজার ভারতীয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজের ভিসার জন্য পাসপোর্টে আশীর্বাদ নিতে বেদি প্রদক্ষিণ করেন। আমেরিকান শ্রমিকদের এমন একটি কারসাজিপূর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য হওয়া উচিত নয়।”

এই ‘ভিসা সিন্ডিকেট’-এর হায়দরাবাদে নিজস্ব একটি ভিসা মন্দির রয়েছে, যেখানে হাজার হাজার ভারতীয় বেদি প্রদক্ষিণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজের ভিসার জন্য পাসপোর্টে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। আমেরিকান শ্রমিকদের এমন একটি কারসাজিপূর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য হওয়া উচিত নয়।
— সিনেটর এরিক শ্মিট (@SenEricSchmitt), ১৩ মে, ২০২৬

তিনি অভিযোগ করেন, আমেরিকার বর্তমান কর্মসংস্থান-ভিত্তিক ভিসা ব্যবস্থাটি মার্কিন মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং স্থানীয় মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে। শ্মিটের কথায়, “এখন ভারতে এআই (AI) প্রশিক্ষণের জন্য শত শত কোটি ডলার পাঠানো হচ্ছে, যার খরচ বহন করছে সাধারণ আমেরিকান জনগণ।”

“মেধার বদলে বর্ণবৈষম্য!” গুরুতর অভিযোগ শ্মিটের
সিনেটর শ্মিট এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি দাবি করেন, H-1B, L-1, F-1 এবং ওপিটি (OPT)-এর মতো প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে বিদেশী শিক্ষার্থীরা (যার প্রায় অর্ধেকই ভারতীয়) মার্কিন করদাতাদের টাকায় কাজের অনুমতি পাচ্ছে। তিনি আরও অভিযোগ তোলেন যে, ভারতীয় ভিসাধারীরা ইন্টারভিউয়ের গোপন প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেয় এবং বড় বড় মার্কিন টেক কোম্পানিগুলো আমেরিকানদের চাকরি থেকে বাদ দিতে এই কৌশল ব্যবহার করছে। তাঁর দাবি, মার্কিন ভিসা ব্যবস্থায় এখন মেধার জায়গা নিয়েছে জাতিগত পক্ষপাতিত্ব বা ‘বর্ণবৈষম্য’।

কী এই ‘ভিসা মন্দির’? কেন এখানে ছোটেন ভারতীয় ইঞ্জিনিয়াররা?
হায়দরাবাদের ওসমান সাগর হ্রদের তীরে অবস্থিত চিলকুর বালাজি মন্দিরটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এবং তেলেঙ্গানার অন্যতম প্রাচীন পুজোস্থল। এই মন্দিরের একটি বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এখানে ভগবান ভেঙ্কটেশ্বরের (বালাজি) দরবারে নিষ্ঠাভরে প্রার্থনা করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ যেকোনো দেশের ভিসা পাওয়ার সমস্ত বাধা কেটে যায়।

১১ বার প্রদক্ষিণ: ভক্তরা প্রথমে ভিসার আবেদন মঞ্জুর হওয়ার কামনায় মন্দিরটি ১১ বার প্রদক্ষিণ করেন।

১০৮ বার প্রদক্ষিণ: মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হওয়ার পর, অর্থাৎ ভিসা হাতে পাওয়ার পর ভক্তরা দেবতাকে ধন্যবাদ জানাতে পুনরায় ফিরে আসেন এবং ১০৮ বার প্রদক্ষিণ করেন।

সম্পূর্ণ সমতার প্রতীক এই মন্দিরে কোনো ভিআইপি (VIP) দর্শনের ব্যবস্থা নেই। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলকেই এক লাইনে দাঁড়িয়ে পুজো দিতে হয়। প্রতিদিন হাজার হাজার আইটি কর্মী এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী ছাত্রছাত্রীরা এখানে ভিড় জমান।

পরিসংখ্যান কী বলছে?
আমেরিকান সিনেটরের এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে এক বিশাল পরিসংখ্যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর যত H-1B ভিসা অনুমোদিত হয়, তার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই পান ভারতীয় পেশাদাররা। এর তুলনায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের নাগরিকরা পান মাত্র ১২ শতাংশ ভিসা। স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন টেক দুনিয়ায় ভারতীয়দের এই একছত্র আধিপত্য মেনে নিতে পারছেন না মার্কিন রক্ষণশীল রাজনীতিকদের একাংশ।

কী এই H-1B ভিসা? কেন এটি এত জনপ্রিয়?
H-1B হলো আমেরিকার একটি বিশেষ অ-অভিবাসী কাজের অনুমতিপত্র (Work Permit)। তথ্যপ্রযুক্তি (IT), ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসা ও গবেষণার মতো ক্ষেত্রগুলিতে বিশ্বের দক্ষ পেশাদারদের নিয়োগ করতে মার্কিন কোম্পানিগুলো এই ভিসার স্পনসর করে।

মেয়াদ ও সুযোগ: প্রাথমিকভাবে ৩ বছরের জন্য এই ভিসা দেওয়া হয়, যা পরে ৬ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যায়।

নাগরিকত্বের সুযোগ: এই ভিসার অধীনে কর্মীরা তাঁদের পরিবারকেও আমেরিকায় নিয়ে যেতে পারেন এবং ৫ বছর পর মার্কিন নাগরিকত্বের (Green Card) জন্যও আবেদন করতে পারেন।

সিনেটর এরিক শ্মিটের এই পোস্টের পর নেটদুনিয়ায় জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভারতীয় নেটিজেনদের একাংশের মতে, ভারতীয়রা নিজেদের মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের জোরেই আমেরিকায় চাকরি পান, কোনো সিন্ডিকেটের জোরে নয়। মন্দিরে পুজো দেওয়াটা কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়, তাকে এভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা অনুচিত।