অর্জুনকে কেন মারতে চেয়েছিলেন কর্ণ? পাণ্ডবদের শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরের প্রতি সেই ভয়ঙ্কর প্রতিজ্ঞার গোপন রহস্য জানুন

মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ মানেই কেবল অস্ত্রের ঝনঝনানি নয়, বরং এটি ছিল এক চরম মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। রাগ, ঘৃণা, অপমান এবং প্রতিশোধের আগুনে পুড়েই রচিত হয়েছিল এই মহাকাব্যের ভাগ্য। আর এই যুদ্ধের সবচেয়ে চর্চিত অধ্যায় হলো দুই মহারথী— কর্ণ ও অর্জুনের দ্বন্দ্ব। কিন্তু কেন অর্জুনকে বধ করাকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়েছিলেন দাতা কর্ণ? তার নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস।

অভিশপ্ত শৈশব ও পরিচয়ের লড়াই
কর্ণের জন্ম ছিল দেবপ্রদত্ত। সূর্যদেবের আশীর্বাদে কুন্তীর গর্ভে তাঁর জন্ম হলেও, সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে কুন্তী তাঁকে নদীতে ভাসিয়ে দেন। সারথী অধিরথ ও রাধা তাঁকে উদ্ধার করে লালন-পালন করেন। জন্মসূত্রে রাজপুত্র হলেও বড় হন ‘সূতপুত্র’ পরিচয়ে। এই জন্মপরিচয়ই আজীবন কর্ণের পিছু ছাড়েনি। বারবার বীরত্বের প্রমাণ দিয়েও তাঁকে নীচুবংশীয় বলে অবজ্ঞা করা হয়েছে, যা তাঁর মনে জন্ম দিয়েছিল তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা।

দ্রোণাচার্যের সভা: সেই কালজয়ী অপমান
মহাভারতের অন্যতম সন্ধিক্ষণ ছিল গুরু দ্রোণাচার্যের শিষ্যদের অস্ত্র প্রদর্শনীর আসর। সেখানে অর্জুন যখন তাঁর ধনুর্বিদ্যার অলৌকিক ক্ষমতা দেখিয়ে রাজপ্রাসাদের সবার প্রশংসা কুড়োচ্ছেন, ঠিক তখনই আসরে প্রবেশ করেন কর্ণ। অর্জুন যা যা করেছিলেন, কর্ণ অবলীলায় সেই সব কসরত করে দেখিয়ে দেন এবং অর্জুনকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানান।

কিন্তু এখানেই বাধে বিপত্তি। কর্ণের পরিচয় জানতে চাওয়া হলে তাঁকে ‘সারথির পুত্র’ বলে অভিহিত করা হয়। রাজপুত্র না হওয়ায় অর্জুনের সঙ্গে লড়াই করার যোগ্যতা তাঁর নেই বলে আসর থেকে তাঁকে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রকাশ্য রাজসভায় সেই ভয়াবহ অপমানই অর্জুনের প্রতি কর্ণের মনে প্রবল ঘৃণার জন্ম দেয়।

প্রতিশোধের অঙ্গীকার
কর্ণ অনুভব করেছিলেন যে তাঁর প্রতিভার কোনো দাম নেই কেবল তাঁর বংশপরিচয় নেই বলে। অন্যদিকে অর্জুন ছিলেন রাজকীয় আভিজাত্য ও সুযোগ-সুবিধার প্রতীক। অর্জুনকে পরাজিত করা মানেই ছিল সেই সমাজের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া যারা তাঁকে প্রতিনিয়ত ছোট করেছে। সেই দিনই কর্ণ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অর্জুনকে পরাজিত ও হত্যা করা তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হবে।

এই ব্যক্তিগত জিদই কুরুক্ষেত্রের রণভূমিতে কর্ণকে এক ভয়ঙ্কর যোদ্ধায় পরিণত করেছিল, যার সামনে স্বয়ং কৃষ্ণকেও বারবার চিন্তিত হতে দেখা গেছে।