বীরভূমের ‘বাঘ’ খাঁচায়! অনুব্রতর গড় ধসিয়ে ৬ আসনে পদ্ম-বিস্ফোরণ, জেলাজুড়ে রণক্ষেত্র, আগুন জ্বলল কীর্ণাহারে!

একসময়ের ‘অজেয়’ লালমাটির জেলা বীরভূমে এবার আছড়ে পড়ল গেরুয়া সুনামি। দোর্দণ্ডপ্রতাপ তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলের সাজানো সাম্রাজ্য কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। জেলার ১১টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৬টিতেই জয়ধ্বজা উড়িয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি। দীর্ঘ বছরের সবুজ দুর্গ এখন গেরুয়া আবিরে ঢাকা, আর সেই জয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে চরম উত্তেজনা ও হিংসার খবর।
উল্টে গেল বীরভূমের অঙ্ক
বাম আমলের অবসান ঘটিয়ে যে বীরভূমকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনিষ্ঠ শক্তিকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন অনুব্রত মণ্ডল, সেখানে এবার বড়সড় ধস নেমেছে। গরুপাচার মামলায় অনুব্রতর জেলযাত্রার সময়ও যে গড় অটুট ছিল, এবার তা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সিউড়ি, রামপুরহাট, ময়ূরেশ্বর, দুবরাজপুর, সাঁইথিয়া এবং লাভপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে ফুটেছে পদ্মফুল। এমনকি বিধানসভার উপাধ্যক্ষ তথা পাঁচবারের বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েটকেও হারের মুখ দেখতে হয়েছে।
ফলাফল পরবর্তী অশান্তি ও আগুন
সোমবার ফলাফল স্পষ্ট হতেই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে হিংসার আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কীর্ণাহারে তৃণমূল কর্মীদের দোকানঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বোলপুর কলেজে গণনা কেন্দ্রের কাছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতেই তৃণমূলের ক্যাম্প অফিস ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার খবর সামনে এসেছে। ভাঙচুর চালানো হয়েছে শ’য়ে শ’য়ে চেয়ারে, আক্রান্ত হয়েছেন তৃণমূলের কাউন্সিলররা। দুবরাজপুরের লোবায় তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতির বাড়ি এবং সিউড়িতে তৃণমূলের শিক্ষা সেলের কার্যালয়েও হামলার অভিযোগ উঠেছে। অশান্তি রুখতে অনুব্রত মণ্ডলের নীচুপট্টীর বাড়ির সামনে মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল কেন্দ্রীয় বাহিনী।
‘খাঁচায় ভরব’—বিজেপির হুঙ্কার
জেলায় সুশাসনের ইঙ্গিত দিয়ে বিজেপির বোলপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল বলেন, “আমরা আগেই গড় ভেঙে দিয়েছি। কেউ ঔদ্ধত্য দেখিয়ে গড় বলতেই পারেন, কিন্তু বীরভূমের বাঘকে একবার খাঁচায় ভরেছিলাম, বেশি বাড়াবাড়ি করলে আবারও খাঁচায় ভরব। মানুষ দুর্নীতি ও অত্যাচারের জবাব দিয়েছে।”
হারের গ্লানি ও অন্তর্ঘাতের বিস্ফোরক অভিযোগ
বিপর্যস্ত তৃণমূল শিবিরে এখন হাহাকার। জয়ের পরেও চন্দ্রনাথ সিনহা মানছেন, “নিশ্চয়ই কোথাও বড় ভুল ছিল, যা পর্যালোচনা করা দরকার।” অন্যদিকে দুবরাজপুরের পরাজিত প্রার্থী নরেশচন্দ্র বাউরি দলের গোষ্ঠী কোন্দল নিয়ে সরাসরি বোমা ফাটিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, জেলা কোর কমিটির সদস্য তথা অনুব্রত-ঘনিষ্ঠ সুদীপ্ত ঘোষই তাঁকে হারিয়ে দিয়েছেন। দলের ভেতরের এই ‘বিপজ্জনক’ ফাটলই কি বীরভূম হারের প্রধান কারণ? উত্তরের খোঁজে এখন রাজনৈতিক মহল।
উন্নয়নের জোয়ার সত্ত্বেও কেন মানুষ মুখ ফেরাল, তা নিয়ে লাভপুরের পরাজিত প্রার্থী অভিজিৎ সিংহও চরম দুশ্চিন্তায়। সব মিলিয়ে, বীরভূমের রাজনৈতিক আকাশ এখন একদিকে গেরুয়া বিজয়োল্লাস, আর অন্যদিকে হারের জ্বালায় দগ্ধ তৃণমূলের গোষ্ঠী কোন্দলে উত্তপ্ত।