‘বুলবুল, আমরা পেরেছি রে…’ কেঁদে ফেলেছিলেন আসরাফুল, মনে আছে কি ‘অকৃতজ্ঞ’ বাংলাদেশের?

ইতিহাসের পাতা কি এতটাই ধূসর যে মাত্র কয়েক দশকেই সব ভুলে যাওয়া যায়? বাংলাদেশ ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থান দেখে ক্রিকেট মহলে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা আর ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে অনীহা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ‘অকৃতজ্ঞ’ মনোভাব নিয়ে বইছে সমালোচনার ঝড়।
নিরাপত্তার অজুহাত নাকি রাজনৈতিক চাল? আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে খেলতে চাইছে না বাংলাদেশ। বিসিবি-র দাবি, খেলোয়াড় ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নেই। এমনকি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আইপিএল ও মুস্তাফিজুর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে বিসিসিআই-এর বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ এনেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটা স্রেফ অজুহাত; পাকিস্তানের সুরে সুর মিলিয়ে ভারতের সঙ্গে শত্রুতা করাই যেন এখন লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই পাকিস্তানই ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের ওপর।
যখন কেউ পাশে ছিল না, ত্রাতা ছিলেন জগমোহন ডালমিয়া আজ যারা ভারতের সমালোচনা করছেন, তারা হয়তো ১৯৯৯-২০০০ সালের ইতিহাস ভুলে গেছেন। তখন বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। কুলীন সমাজ অর্থাৎ টেস্ট খেলার যোগ্যতা অর্জনে বারবার বাধা আসছিল। সেই চরম সংকটে ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসেন তৎকালীন আইসিসি চেয়ারম্যান ও বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট জগমোহন ডালমিয়া। কোনো দেশই যখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্ট খেলতে রাজি হচ্ছিল না, তখন ডালমিয়ার একক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ১০ম দেশ হিসেবে টেস্ট স্ট্যাটাস পায়।
সেই ঐতিহাসিক দিন ও বাঙালির আবেগ ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর। ঢাকার মাঠে ভারতের বিপক্ষেই অভিষেক ঘটে বাংলাদেশের। একদিকে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, অন্যদিকে নাঈমুর রহমান দুর্জয়। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সেই ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি আর ম্যাচ শেষে ক্রিকেটারদের চোখের জল আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে পড়ে। তৎকালীন ক্রিকেটাররা স্বীকার করেছিলেন, ভারত ও ডালমিয়া না থাকলে বাংলাদেশের টেস্ট খেলা স্বপ্নই থেকে যেত। এমনকি লর্ডসের মিটিং রুমে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তৎকালীন কর্মকর্তারা।
১৫টি সিরিজ হার ও ভারতের নিঃস্বার্থ সমর্থন টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর প্রথম ৫ বছর বাংলাদেশ কেবল হেরেই গেছে। ৩১টি ম্যাচের মধ্যে ২৮টিতেই হার। টানা ১৫টি সিরিজ হারের পরও ভারত সবসময় বাংলাদেশের পাশে থেকেছে, দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে তাদের অভিজ্ঞতা বাড়াতে সাহায্য করেছে। ২০১৫ সালে ডালমিয়ার প্রয়াণের পর বিসিবি মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমাম বলেছিলেন, “বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতিতে ডালমিয়ার অবদান কোনোদিন ভোলার নয়।”
উপসংহার: আজ যখন পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্যতা বাড়িয়ে ভারতের মাটিতে খেলতে আপত্তি তোলা হচ্ছে, তখন প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ কি সেই পুরনো ঋণ ভুলে গেল? নাকি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বিসিবি-র স্মৃতিশক্তিকেও কমিয়ে দিয়েছে? ইতিহাসের হাত ধরে যে দেশের উত্থান, সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করার ফল কখনো শুভ হয় না।