‘পেহচান’ কোনো প্রকল্প নয়, এটি আত্মবিশ্বাস! বস্তির শিশুদের কেন স্কুলে ভর্তি করান না বাবা-মায়েরা? কারণ জানালেন আকাশ ট্যান্ডন

শিশুদের হাতে উঠছে কলম, তারা শিখছে অক্ষর ও শব্দ। নেপথ্যে আকাশ ট্যান্ডন এবং তাঁর তৈরি ‘পেহচান স্ট্রিট স্কুল’ (Pehchaan Street School)। সদ্যসমাপ্ত রামোজি এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এ পুরস্কৃত হয়েছেন আকাশ ট্যান্ডন তাঁর এই মানবসেবামূলক কাজের জন্য। এই সমাজকর্মী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, কারণ তিনি এমন একটি পৃথিবী গড়তে চান যেখানে শিশুর শিক্ষা তার জন্মস্থানের উপর নির্ভর করবে না। ইটিভি ভারতকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন তাঁর এই স্বপ্নের কারণ ও পথচলার গল্প।

আকাশ ট্যান্ডন মনে করেন, পাশ করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বিষয় নয়। অর্থের বিনিময়ে অর্জিত শিক্ষায় দেশপ্রেম, ভদ্রতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রায় বিলুপ্ত। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত মানুষ গড়ার লক্ষ্য নিয়েই তাঁর যাত্রা শুরু।

শুরুর গল্প… বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র দিল্লির অফিস থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরে একটি বস্তি রয়েছে, যেখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বাস। এই বস্তিতে পরিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসেবার মতো ন্যূনতম চাহিদার অভাব রয়েছে। কয়েক বছর আগেও সেখানে শিক্ষা ছিল স্বপ্নের মতো। আকাশ জানালেন, প্রথমবার যখন তিনি সেখানে পৌঁছান, তখন বুঝতেই পারছিলেন না শুরুটা কীভাবে করবেন। তাঁর কথায়, “আমাদের কোনও পরিকল্পনা ছিল না। আমরা কয়েকজন মিলে সেখানে গিয়ে কিছু বাচ্চা ও তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সেদিন অগাধ প্রত্যাশা নিয়ে ফিরেছিলাম। সেখান থেকে আজ আমার স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েছি।”

‘পেহচান’-এর পরিচিতি ও পথচলা বর্তমানে ‘পেহচান স্ট্রিট স্কুল’ একটি সুপরিচিত নাম। গুগল সার্চেও এই শিক্ষা আন্দোলন নিজের নাম লিখিয়েছে। এটি এখন হাজার হাজার পড়ুয়া, ১২০০ ইন্টার্ন, স্বেচ্ছাসেবক এবং ১০০-রও বেশি সাংগঠনিক অংশীদার নিয়ে গড়ে ওঠা একটি স্বেচ্ছাসেবক-চালিত শিক্ষা আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আকাশ জানালেন, “যখন শুরু করি, তখন এই রাস্তার স্কুলের কোনও বেঞ্চ, দেওয়াল, ব্ল্যাকবোর্ড কিছুই ছিল না। তখন আমাদের কাছে শুধু ১০টা খাতা-কলম ছিল ওদের দেওয়ার জন্য। ওদের মুখ দেখে মনে হয়েছিল, ওরা শেখার জন্য ক্ষুধার্ত। ওই অনুভূতিটা আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।”

ইটিভি ভারতের প্রশ্নের উত্তরে আকাশ ট্যান্ডন জানালেন, এই শিশুরা স্কুলে যায় না কারণ, তারা অন্য রাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের সন্তান। কেউ ভিক্ষা করে দিন গুজরান করে, কাউকে হয়তো বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল এবং তারা পালিয়ে এসে বস্তিতে বসবাস শুরু করে। তাই তাদের কাছে স্কুলে যাওয়া ছিল দূরস্থ স্বপ্ন। ট্যান্ডন বললেন, “এরপর আমরা ফুটপাতে পড়ানো শুরু করলাম। সেই সিদ্ধান্ত যে পরবর্তী দশকে ৫ হাজার শিশুকে প্রভাবিত করবে তা হয়তো সেদিন বুঝিনি।”

কেন ‘পেহচান’ আলাদা? শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে আলাদা না হলেও, এই প্রতিষ্ঠান শিশুদের মানসিকতা যেভাবে পরিবর্তন করে সেখানেই পার্থক্য। এখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন হয়, আইডেন্টিটি কার্ড দেওয়া হয়, উপস্থিতি ও গতিবিধির উপর নজর রাখা হয়। চার থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থীর জন্য একজন স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত থাকেন।

পেহচান কেন আলাদা, এই প্রশ্নে ট্যান্ডন বললেন, “পেহচান কোনও ‘প্রকল্প’ নয়। এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি। শুধু সাক্ষরতার জন্য নয়, এটি একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। জীবনের বেঁচে থাকার অধিকারকে বোঝায়। স্বাস্থ্য ও সমাজ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। এক অর্থে, পেহচান সবসময়ই বিষয় সম্পর্কে কম, মর্যাদা সম্পর্কে বেশি ছিল।”

‘পেহচান’-এর আগামী লক্ষ্য আকাশের পথচলা শুরু হয় ২০১৫ সালে। দশ বছরের মাথায় তাঁর স্বপ্ন এখন আরও বড়। তিনি বলেন, “আমি এমন একটি পৃথিবী চাই যেখানে শিশুর শিক্ষা তাদের জন্মস্থানের উপর নির্ভর করবে না। এটা একটা বড় স্বপ্ন। আমরা জানি, প্রথম স্বপ্নটাকে কীভাবে পূরণ করেছিলাম। যখন পেহচান শুরু হয়, তখন ৫ জন স্বেচ্ছাসেবক, ১০ জন শিশু এবং দিল্লির একটা ফুটপাথ ছাড়া আর কিছু ছিল না। প্রবল উৎসাহ এবং সদিচ্ছা দিয়েই আমরা এগিয়ে চলেছি।”