ভূতেদের মুক্তি ও নৈবেদ্য! আসানসোলের মহিশীলা মন্দিরে ৭৩ বছর ধরে চলছে সেই রহস্যময় পরম্পরা

ভূত চতুর্দশী মানেই বাঙালি বাড়িতে ১৪ শাক খাওয়ার রীতি। কিন্তু আসানসোলের মহিশীলা কলোনীর গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানকার বাসিন্দারা বিশ্বাস করেন, ভূত চতুর্দশীর রাতে কিছু সময়ের জন্য ‘তেনারা’ অর্থাৎ ভূতেরা সাময়িকভাবে মুক্তি পান এবং তাঁদের বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয়। এরপর কালীপুজোর রাতে মন্ত্রবলে ফের সেই ভূতেদের বন্দি করা হয়। বিগত প্রায় ৭৩ বছর ধরে এই কলোনীতে এই অদ্ভূত পরম্পরায় পুজো হয়ে আসছে।

স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, বামাক্ষ্যাপার অন্যতম প্রধান শিষ্য তান্ত্রিক বনমালী ভট্টাচার্য প্রায় সাত দশক আগে মহিশীলার ১ নম্বর কলোনীর পিয়ালবেড়া শ্মশানের একটি বটগাছে মন্ত্রবলে ভূতেদের দল বেঁধে দিয়ে গিয়েছিলেন। শোনা যায়, সেই সময় পিয়ালবেড়া শ্মশান ছিল জঙ্গলে ভরা এবং ভূতেদের ভয়ানক উপদ্রব ছিল। রাতে কেউ মারা গেলে ভয়ে এলাকাবাসী মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যেতে পারত না, দিনের আলো ফোটার জন্য অপেক্ষা করতে হত। মানুষের ক্ষতি রুখতেই নাকি বনমালীবাবু ভূতেদের সেই গাছে বেঁধে দেন।

বর্তমানে বনমালী ভট্টাচার্য আর জীবিত নেই, কিন্তু এলাকাবাসীর বিশ্বাস, সেই বটগাছে আজও ভূতেদের দল রয়ে গিয়েছে।

বনমালীবাবুর ছেলে বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য বর্তমানে এই পুজোর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তিনি জানান, কার্তিক অমাবস্যার আগের দিন ভূত চতুর্দশীতে সেখানে কালীপুজো হয়। এটি আসলে মায়ের বীজমন্ত্রের পুজো। পুজোর আগে সেই গাছে বাঁধা ভূতেদের কিছু সময়ের জন্য ‘বাঁধনছাড়া’ করা হয়। এরপর শিবাভোগ ও ভৈরব ভোগ দেওয়া হয়। এই ভোগের মধ্যে থাকে— ভাত, মাংস এবং কারণ (মদ)। মোট তিনবারে এই ভোগ নিবেদন করা হয়।

ভূত চতুর্দশীর এই বিশেষ পুজোর পর ফের কালীপুজোর রাতে সেই অপদেবতাদের মন্ত্রবলে গাছের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। এই দিনটিকে এখানকার মানুষ ভূতেদের মুক্তির দিন হিসেবে পালন করেন।

বহু বছর আগে পিয়ালবেড়া শ্মশান উঠে গেলেও সেই স্থানে তান্ত্রিক বনমালীর তৈরি করা আশ্রমের মন্দির এবং পঞ্চমুণ্ডির আসনটি এখনও বর্তমান। একসময়ের ভুতুড়ে স্থান এখন ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে এই অদ্ভূত পরম্পরার জন্য।