“মহাকাশে হাজারো স্যাটেলাইটের ভিড়ে গবেষণাই দায়”-জেনেনিন কেন একথা বলছে বিজ্ঞানীরা?

স্টারলিংকের স্যাটেলাইট মহাকাশ গবেষণায় বাধা দিচ্ছে: বিজ্ঞানীদের গুরুতর সতর্কতা!
পার্থ, অস্ট্রেলিয়া, ২৫ জুলাই, ২০২৫: দ্রুত ও বিস্তৃত পরিসরে ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছে দিতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে, তা মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণাকে দিন দিন কঠিন করে তুলছে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স কোম্পানির স্টারলিংক স্যাটেলাইট প্রকল্প, যা পৃথিবীর কক্ষপথে হাজার হাজার স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে পুরো পৃথিবীকে ইন্টারনেট সংকেতে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করছে, তা রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফলে মহাকাশ পর্যবেক্ষণে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা গুরুতর সমস্যায় পড়ছেন বলে ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।

যেভাবে বাধা তৈরি হচ্ছে:
গবেষকরা বলছেন, এসব স্যাটেলাইট থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু সংকেত বেরিয়ে আসে। এই সংকেতগুলো মহাবিশ্ব দেখার জন্য বিজ্ঞানীরা যে অত্যন্ত ক্ষীণ বিভিন্ন রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করেন, সেগুলোকে ঢেকে ফেলে। এর ফলে বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ রেডিও সংকেত পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন না, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার জন্য অপরিহার্য।

কার্টিন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা নতুন এই গবেষণায় স্পেসএক্সের স্টারলিংক প্রকল্পের ওপর বিশেষভাবে নজর দিয়েছেন, কারণ কক্ষপথে তাদের স্যাটেলাইটের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দ্রুত ও বড় পরিসরে ইন্টারনেট সরবরাহের পরিকল্পনা করছে এমন আরও অনেক কোম্পানির ওপরও তারা নজর রাখছেন।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য:
এই গবেষণায় ‘স্কয়ার কিলোমিটার অ্যারে’ (SKA) টেলিস্কোপের প্রাথমিক সংস্করণ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা আকাশের ৭ কোটি ৬০ লাখ ছবি সংগ্রহ করেছেন। এই SKA টেলিস্কোপ এ দশকের শেষ নাগাদ সম্পূর্ণ হলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও সংবেদনশীল রেডিও টেলিস্কোপ হবে। সেইসব তথ্যের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ১ হাজার ৮০৬টি স্টারলিংক স্যাটেলাইট থেকে ১ লাখ ১২ হাজারেরও বেশি রেডিও সংকেত শনাক্ত করেছেন। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত সংকেত মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেডিও সংকেত পর্যবেক্ষণ করাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

গবেষণার প্রধান গবেষক ডিলান গ্রিগ বলেছেন, “রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য স্টারলিংকই সবচেয়ে বড় ও বেশি বাধা তৈরি করছে। গবেষণার কেবল চার মাসের মধ্যেই স্টারলিংক ৪৭৭টি স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে পৃথিবীর কক্ষপথে, যা বাধার কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও জানান, “কিছু তথ্যের মধ্যে আমরা দেখেছি আকাশের ছবি তোলার সময় আমাদের ছবিগুলোর প্রায় ৩০ শতাংশে স্টারলিংক স্যাটেলাইটের কারণে ছবি বা তথ্যের গুণমানে বাধা তৈরি হয়েছিল।”

অপ্রত্যাশিত ফ্রিকোয়েন্সি ও অনিয়ন্ত্রিত সংকেত:
এই সংকেতগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই স্যাটেলাইট থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে পাঠানো হয়নি এবং এগুলো প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে জোরালোভাবে আসছিল। ফলে গবেষকদের জন্য সেগুলো আলাদা করে খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রিগ বলেছেন, “কিছু স্যাটেলাইট এমন ফ্রিকোয়েন্সিতে সংকেত পাঠাচ্ছে যেখানে কোনো সংকেত থাকার কথাই নয়। যেমন– আমরা ৭০৩টি স্যাটেলাইটকে ১৫০.৮ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে সংকেত পাঠাতে দেখেছি, যা রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য নিরাপদ রাখা হয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট করা নিরাপদ এলাকার বাইরেও সংকেত ছড়াচ্ছে এসব সংকেত, যা সমস্যা তৈরি করছে।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “স্যাটেলাইটের ভেতরের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির মতো অংশ থেকে এসব সংকেত অনিচ্ছাকৃতভাবে বেরিয়ে আসে, যেগুলো কোনো পরিকল্পিত বা উদ্দেশ্যপূর্ণ সংকেত নয়। ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পক্ষে এগুলো আগেভাগে বোঝা বা সেগুলোকে দূর করার বিষয়টি কঠিন।”

ভবিষ্যৎ প্রভাব ও ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা:
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, স্যাটেলাইটের সংকেতের কারণে তৈরি হওয়া এই বাধা একসময় মহাবিশ্বের গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ সত্যগুলো বোঝাকে পুরোপুরি অসম্ভব করে তুলতে পারে। এ গবেষণার সহ-লেখক স্টিভেন টিংগে বলেছেন, “আমরা এক সোনালী যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছি, যেখানে স্কয়ার কিলোমিটার অ্যারে আমাদের বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে সাহায্য করবে। যেমন– প্রথমবারের মতো তারা কীভাবে তৈরি হয়েছিল, ডার্ক ম্যাটার কী ও আইনস্টাইনের বিভিন্ন তত্ত্বও এতে পরীক্ষা করা যাবে।”

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, “তবে এর সাফল্যের জন্য স্কয়ার কিলোমিটার অ্যারের নীরবতা প্রয়োজন। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটের সুবিধা বাড়ানোর গুরুত্ব আমরা বুঝি। তবে এর পাশাপাশি আমাদের এমনভাবে এগোতে হবে যেন বিজ্ঞানের ক্ষতি না হয়। দুইয়ের মধ্যে আমাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। সেই ভারসাম্য তৈরি হয় সমস্যাটিকে বোঝার মধ্যদিয়ে, যা আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য।” বিজ্ঞানীদের এই সতর্কতা দ্রুত ও বিস্তৃত ইন্টারনেট পরিষেবার সঙ্গে মহাবিশ্ব গবেষণার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরছে।