“২০সেকেন্ডে ছুড়লো ৪০টি রকেট…”-জেনেনিন কোন ‘অস্ত্র’ দিয়ে থাইল্যান্ডে হামলা চালাল কম্বোডিয়া?

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই, ষষ্ঠ বর্ষপূর্তির এই সংঘাতের প্রধান কারণ ছিল রয়েল কম্বোডিয়ান সেনাবাহিনীর RM-৭০ মাল্টিপল-লঞ্চ রকেট সিস্টেম (MLRS) ব্যবহার করে থাইল্যান্ডের ভূখণ্ডে আক্রমণ। এই হামলা শুরু হয় বিতর্কিত প্রিয়া ভিহিয়ার এবং তা মুয়েন থম মন্দির সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায়, যার মূল কারণ ১৯০৭ সালের ফরাসি মানচিত্র নিয়ে দুই দেশের অমীমাংসিত দাবি।
এই যুদ্ধ ইতিমধ্যেই উভয় দেশেই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে, প্রাণহানি ঘটেছে বহু মানুষের, ঘরবাড়ি হয়েছে লণ্ডভণ্ড এবং বেড়েছে অস্ত্রের চাহিদা। এই পরিস্থিতিতে কম্বোডিয়ার ব্যবহৃত RM-৭০ রকেট সিস্টেমটি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আসুন, এই বিধ্বংসী অস্ত্র এবং এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি।
২০২৫ সালের ২৪ জুলাই, সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে থাইল্যান্ডের সুরিন প্রদেশের মু পা ঘাঁটির কাছে প্রথম গোলাগুলি শুরু হয়। এর কিছু পরেই, সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে কম্বোডিয়া তাদের RM-৭০ MLRS থেকে ১২২ মিমি রকেট নিক্ষেপ করে, যা থাইল্যান্ডের সিসাকেট প্রদেশের ডন টুয়ান মন্দিরের কাছাকাছি এলাকায় আঘাত হানে।
এই আকস্মিক হামলায় থাইল্যান্ডের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একটি পেট্রোল পাম্প, একটি সুপারমার্কেট এবং বেশ কিছু ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। থাইল্যান্ডও এর কড়া জবাব দিয়েছে। তারা তাদের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং ড্রোন ব্যবহার করে কম্বোডিয়ার সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। উভয় দেশই একে অপরের উপর প্রথম হামলার দায় চাপাচ্ছে এবং দোষারোপের পালা চলছে।
এই সংঘাতের মূল উৎস প্রিয়া ভিহিয়ার এবং তা মুয়েন থম মন্দিরের আশেপাশের এলাকা, যা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবেও স্বীকৃত। ১৯০৭ সালে ফ্রান্স এই অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ করেছিল, কিন্তু আজও উভয় দেশ সেই সীমানা মেনে নিতে রাজি নয়। এর আগে, ২০২৫ সালের মে মাসে একজন কম্বোডিয়ান সৈন্যের মৃত্যুর পর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় এবং অবশেষে তা একটি প্রকাশ্য যুদ্ধে রূপ নেয়।
RM-70 MLRS: এক বিধ্বংসী অস্ত্র:
RM-70 মাল্টিপল-লঞ্চ রকেট সিস্টেম একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক সরঞ্জাম, যা ১৯৭০ সালে চেকোস্লোভাকিয়া (বর্তমানে চেক প্রজাতন্ত্র এবং স্লোভাকিয়া) তৈরি করেছিল। এটি মূলত BM-21 গ্র্যাড রকেট সিস্টেমের একটি উন্নত সংস্করণ। রাতের অন্ধকারেও নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হওয়ায় এটি ‘ভ্যাম্পায়ার’ নামেও পরিচিত।
RM-70 MLRS-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য:
নকশা: এটি টাট্রা টি৮১৩ ৮x৮ ট্রাকের উপর বসানো, যাতে ৪০টি রকেট টিউব রয়েছে। এটি মাত্র ২০ সেকেন্ডে ৪০টি রকেট নিক্ষেপ করতে পারে।
পাল্লা: ৯এম২২ইউ রকেট ব্যবহার করে এর পাল্লা ২০-৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
নির্ভুলতা: তুলনামূলকভাবে কম নির্ভুল হলেও, এটি একটি বিশাল এলাকা ধ্বংস করতে সক্ষম।
ওজন ও পুনরায় লোড: এটির ওজন প্রায় ৩৩ টন এবং এটি অতিরিক্ত ৪০টি রকেট পুনরায় লোড করার ক্ষমতা রাখে।
বর্ম: ট্রাকের কেবিন সাঁজোয়া, যা ক্রুদের বুলেট এবং গোলার আঘাত থেকে রক্ষা করে।
ব্যবহার: কম্বোডিয়ার কাছে ৩৬টি RM-৭০ রয়েছে, যা তারা ১৯৮০ সালে চেকোস্লোভাকিয়া থেকে কিনেছিল।
RM-70 ১২২ মিমি রকেটগুলিতে (যেমন ৯এম২২ইউ) উচ্চ-বিস্ফোরক অথবা অগ্নিসংযোগকারী ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়। এই রকেটগুলি একটি বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আগুন এবং শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, যার ফলে ভবন, যানবাহন এবং মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হয়। RM-70 ‘ভ্যাম্পায়ার’-এর ডিজিটাল অগ্নি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাতেও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়ক।
এই সংঘাত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। RM-70-এর মতো বিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে, যার ফলস্বরূপ নিরীহ মানুষের জীবন ও সম্পত্তি বিপন্ন হচ্ছে।