বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালি হেনস্থা, সংসদে আলোচনা চায় কংগ্রেসও, তৃণমূলের সুরে মেলালো সুর

বিজেপি শাসিত ওড়িশায় বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থার অভিযোগ ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন শুধু আইনি লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পরিণত হয়েছে জাতীয় রাজনীতির এক নতুন উত্তাপে। বুধবার কলকাতা হাইকোর্টে এই মামলার শুনানি চলাকালীন ওড়িশা সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেল যেখানে “ওড়িশা-বাংলা ভাই ভাই” স্লোগান দিয়েছেন, সেখানেই আদালত তার বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে না পেরে কড়া নির্দেশ দিয়েছে। একই সময়ে দিল্লির সংসদে এবং কলকাতার রাজপথে এই ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক চাপান-উতোর তুঙ্গে উঠেছে।
আদালতের কড়া নির্দেশ
বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ এই মামলার শুনানিতে ওড়িশা সরকারকে হলফনামা পেশ করার নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের মূল প্রশ্ন, কেন মুর্শিদাবাদের ওই পরিযায়ী শ্রমিকদের আটক করা হয়েছিল, কীসের ভিত্তিতে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল, এবং কী কারণে তাদের শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া হলো? এই সমস্ত প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব চার সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা দিয়ে জানাতে হবে। আদালত জানায়, ২৯শে আগস্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।
এর আগে বাংলার আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, প্রায় চারশো শ্রমিককে আটকে রেখে মারধর করা হয়েছে। যদিও ওড়িশার অ্যাডভোকেট জেনারেল পীতাম্বর আচার্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “বাঙালি-অবাঙালি বলে বিভ্রান্ত করবেন না। এটা দেশের ব্যাপার। ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী তাদের নাগরিকত্ব যাচাই করা হচ্ছিল।” এর উত্তরে রাজ্যের আইনজীবী পাল্টা প্রশ্ন করেন, “কেন বেছে বেছে কেবল বাঙালিদেরই নাগরিকত্ব যাচাই করা হচ্ছে?”
সংসদ থেকে রাজপথ: রাজনৈতিক প্রতিবাদ
এই ঘটনার প্রতিবাদে দিল্লির সংসদে সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের পেশ করা মুলতবি প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাওয়ায় তৃণমূল সাংসদরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং সংসদের ভিতরে-বাইরে লাগাতার বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তৃণমূলের এই প্রতিবাদে পাশে দাঁড়িয়েছে কংগ্রেসও। তারা সামাজিক মাধ্যমে বিজেপিকে নিশানা করে বলেছে, “বিজেপি এত নীচে নেমে গেছে যে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি মালদা-মুর্শিদাবাদের বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের টার্গেট করছে।” কংগ্রেসও এই ইস্যুতে সংসদে আলোচনার দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, কলকাতায় বামপন্থীরাও এই ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার বিশাল মিছিল করেছে। সিপিএম নেতা সেলিম সরাসরি তৃণমূল এবং বিজেপিকে নিশানা করে বলেছেন যে, উভয় দলই ২০২৬ সালের দিকে তাকিয়ে ‘ভাষা আন্দোলনের নামে’ রাজনীতি করছে এবং পরিযায়ীদের সুরক্ষা দেওয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না।
সব মিলিয়ে, ওড়িশার একটি স্থানীয় ঘটনা এখন কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে এবং দিল্লি ও কলকাতার রাজনৈতিক বিতর্কে এক বৃহত্তর জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। দিঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ নিয়ে বাংলা-ওড়িশার পুরনো টানাপড়েনের রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন বিতর্ক দু’রাজ্যের সম্পর্ক এবং দেশের ফেডারেল কাঠামোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।