উত্তমের পরও জীবনে এসেছিল প্রেম, তবুও কেন অবিবাহিত থেকে গেলেন সাবিত্রী?

বাঙালির ‘ম্যাটিনি আইডল’ উত্তম কুমার! তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল বর্ণময়, প্রেম এসেছে একাধিকবার। গৌরীদেবীকে বিয়ে করলেও, সহ-অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গুঞ্জন ছিল। সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তিনি খোলামেলাভাবে সংসার থেকে দূরে একসঙ্গে ছিলেন। আর যে প্রেমের কাছে তিনি বারবার ফিরে গিয়েছিলেন, তা হলো আরও এক সহ-অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। উত্তম কুমার কিছুতেই মানতে পারতেন না তাঁর প্রাণপ্রিয় সাবিত্রী অন্য কাউকে বিয়ে করে সংসার করবেন, তাই তিনি বারবার ভেস্তে দিয়েছিলেন সাবিত্রীর বিয়ের প্রস্তাব। উত্তম-সাবিত্রীর প্রেম নিয়ে সকলেই অল্পবিস্তর অবগত। কিন্তু জানেন কি, উত্তম পরবর্তী সময়ে সাবিত্রীর জীবনে আরও এক প্রেম এসেছিল, যা তাঁকে সব অর্থেই ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল? সাবিত্রীর সেই প্রেমিকও ছিলেন একজন অভিনেতা।
অখ্যাত প্রেমিকের কাছে আত্মসমর্পন:
সেই ব্যক্তি উত্তমকুমারের মতো খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি, তাই তাঁকে নিয়ে হইচইও কম। কিন্তু সাবিত্রীর মনের মণিকোঠায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছিলেন সেই অভিনেতা। একবার এক সাক্ষাৎকারে সাবিত্রী খোলাখুলি জানিয়েছিলেন, তিনি বিয়ে করতে পারেননি, কারণ তাঁর সঙ্গে যে সব পুরুষ সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, তাঁদের আগে থেকেই বাড়িতে একজন ‘বউ’ ছিল। এখনকার সময় হলে হয়তো তাঁর প্রেমিকেরা আগের স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে সাবিত্রীকেই বিয়ে করে নিতেন। কিন্তু সাবিত্রী তাতে রাজি হতেন কি না, তা জানা নেই। তিনি কোনোদিনও কারও সংসার ভাঙেননি। বরং তিনি নিজে ভিতরে-ভিতরে ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিলেন।
যার কথা বলা হচ্ছে, তিনি হলেন সর্বেন্দ্র সিং। সাবিত্রীর মনে এতটাই পাকা ছিল এই সর্বেন্দ্রর জায়গা যে, তাঁকেই মনে-মনে ‘স্বামী’ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন সাবিত্রী। এবং ‘দুর্ভাগ্যবশত’ উত্তমকুমারের মতো সেই ব্যক্তিও ছিলেন বিবাহিত। সাবিত্রী যে বিবাহিত পুরুষদের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়েছিলেন, তাঁদের কারও সংসার ‘ভাঙেননি’। সর্বেন্দ্রর বেলাতেও তাই হয়েছিল।
ভালোবাসা ও যন্ত্রণার সহাবস্থান:
জানা যায়, সর্বেন্দ্র দিনের পর দিন সাবিত্রীর বাড়িতেই পড়ে থাকতেন। তিনি নেশায় বুঁদ থাকতেন, যার কারণে পেটে তীব্র যন্ত্রণা হতো। সাবিত্রী সেই যন্ত্রণা মেটানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর অস্ত্রোপচারের সব রকম ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মুম্বইয়ে হয়েছিল সেই অস্ত্রোপচার। সাবিত্রীর অনেক আশা ছিল, তিনি অন্তত এক মাস প্রেমিকের সঙ্গে মুম্বইয়ে কাটাবেন। কিন্তু তিনি পারলেন না। সর্বেন্দ্র মুম্বইয়ে যাওয়ার বেলায় স্ত্রীকেই নিয়ে গিয়েছিলেন সঙ্গে। যদিও সর্বেন্দ্র সাবিত্রীকে এবং সাবিত্রী সর্বেন্দ্রকে ‘স্বামী-স্ত্রী’ হিসেবেই গ্রহণ করে নিয়েছিলেন বলে শোনা যায়।
‘সত্যি সাবিত্রী’তে দাম্পত্যের স্বীকৃতি:
তাঁর আত্মজীবনী ‘সত্যি সাবিত্রী’তে অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় সর্বেন্দ্রকে নিজের স্বামীর স্বীকৃতি দিয়ে এক মর্মস্পর্শী কথা লিখেছিলেন:
“যতই বিনি সুতোর মালার সম্পর্ক হোক না কেন, তবু আমি তো মনেপ্রাণে ওঁকে আমার যত না বন্ধু ভাবি, তার থেকে অনেক বেশি ভাবি—উনি আমার স্বামী। সিঁথিতে না হয় নাই বা সিঁদুর ছোঁয়ানো হল, হাতে না হয় না-ই বা শাঁখা উঠল, না হয় সানাই বাজিয়ে বেনারসি আর ফুলে মালায় সেজে হাতে হাত রেখে বিয়ের মন্ত্র নাই বা উচ্চারণ করা হল, দু’টো হৃদয় কি আগেই তাদের আপন রঙে সাজেনি? দু’টো মন কি নীরবে-নিভৃতে বিবাহমন্ত্র উচ্চারণ করেনি? বাকি সবটুকু তো বাইরের…”
এই অংশটুকু সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের এক গভীরতম ব্যক্তিগত সম্পর্কের নিবিড়তা ও যন্ত্রণাকে তুলে ধরে। খ্যাতিহীন এক পুরুষের প্রতি তাঁর এই নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং তাকে মানসিকভাবে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করার ঘটনা সাবিত্রীর জীবনের এক ভিন্ন অধ্যায় উন্মোচন করে।