কসবা কাণ্ডের ছায়া, কলেজগুলিতে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগে স্বজনপোষণ? উত্তরায়ণ রাজা প্যারীমোহন কলেজে বিতর্কের ঝড়

কসবা ধর্ষণ কাণ্ডে কলেজেরই এক অস্থায়ী কর্মীর নাম জড়ানোর পর রাজ্যের কলেজগুলিতে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, শাসকদলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই নিয়ম ভেঙে চাকরি পাওয়া যায়। এই আবহে এবার উত্তরপাড়া রাজা প্যারীমোহন কলেজে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ ঘিরে বিতর্কের ঝড় উঠেছে।

কসবা থেকে প্যারীমোহন: একই চিত্র?
সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজে ধর্ষণ কাণ্ডে অভিযুক্ত মূল ব্যক্তি ওই কলেজেরই অস্থায়ী কর্মী। অভিযোগ উঠেছে, তিনি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সঙ্গে যুক্ত। এই ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শাসকদলের প্রভাব খাটিয়ে চাকরির অভিযোগ জোরালো হয়েছে। অনেকে বলছেন, শুধুমাত্র শাসকদলের অনুগামী হওয়ার কারণেই এক প্রাক্তন ছাত্রকে চাকরি দেওয়া হয়েছিল।

এবার একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে উত্তরপাড়া রাজা প্যারীমোহন কলেজে। তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের পর থেকে এই কলেজে মোট ২৭ জনকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে অন্তত ১০ জন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সদস্য বলে জানা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বাকিরাও তৃণমূলের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।

বিরোধীদের তোপ: ‘দুর্নীতিবাজদের আঁতুড়ঘর’
কসবার ঘটনার পর এই প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, তৃণমূল ছাত্র পরিষদ করলেই কি কলেজে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে চাকরি পাওয়া যায়? হুগলি জেলা এসএফআই (SFI)-এর সম্পাদক অর্ণব দাস এই প্রসঙ্গে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতা হলেই প্যারীমোহন কলেজে অস্থায়ী চাকরি পাওয়া যায়। দুর্নীতিবাজদের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে এই কলেজ।”

একই সুর শোনা গেছে বিজেপির শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলার নেতা ইন্দ্রনীল দত্তের গলাতেও। তিনি অভিযোগ করেছেন, “যারা তৃণমূলের ঝান্ডা ধরছে, তাদেরই এইভাবে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়া, পরীক্ষা না নিয়ে কলেজে চাকরি দেওয়া হচ্ছে। শুধু উত্তরপাড়া কলেজে নয়, বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে।”

তৃণমূলের পাল্টা যুক্তি: ‘ট্র্যাডিশন’ ও প্রাক্তন বিধায়কের সমর্থন
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৃণমূলের পক্ষ থেকে ভিন্ন যুক্তি দেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে ২১ সাল পর্যন্ত উত্তরপাড়ার তৃণমূল বিধায়ক প্রবীর ঘোষাল, যিনি রাজা প্যারীমোহন কলেজের গভর্নিং বডির সদস্যও ছিলেন, বলেছেন, “সিপিএমের আমলে পার্টির মেম্বার ছাড়া কেউ চাকরি পায়নি বলে আমরা দেখেছি। সেখানে ইন্টারভিউ হত কিনা সেটা জানি না। তবে এতে আমি কোনো অন্যায় দেখি না।”

প্রবীর ঘোষাল আরও বলেন, “নিয়োগের পদ্ধতিতে কোনো গোলমাল থাকলে সেটা নিশ্চয়ই মান্যতা দেওয়া উচিত নয়। কসবাকাণ্ডে মূল অভিযুক্তর ফাঁসি হওয়া উচিত। তবে তার মানেই সব কলেজে কে কাকে চাকরি দিয়েছে, সেটা নিয়ে বলা ঠিক নয়। বেকাররা চাকরি পাবে, সে দল করুক না করুক। সিপিএমের এ ব্যাপারে বলা সাজে না। এটা নিয়ে রাজনীতি করারও কিছু নেই।” উত্তরপাড়া কলেজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এখানে যা নিয়োগ হয়েছে সমস্ত ইন্টারভিউ নিয়ে হয়েছে। কোনো বেআইনি নিয়োগ হয়েছে বলে আমার কাছে কেউ নালিশ করেনি কোনোদিন। আজকে যাঁরা বলছেন তখন কি তাঁরা ঘুমোচ্ছিলেন?”

উত্তরপাড়া পৌরসভার আট নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর তাপস মুখোপাধ্যায় এই বিষয়টিকে ‘ট্র্যাডিশন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “সিপিএমের আমলেও এরকম অনেক চাকরি হয়েছে, যারা ইন্টারভিউ না দিয়ে চাকরি করেছে। এটা একটা ট্র্যাডিশন। যে যখন কলেজে ক্ষমতায় থাকে, সুযোগ থাকলে ছেলেদের ঢুকিয়ে দেয়। সেটা কলেজের ছেলে হতে পারে, বাইরের ছেলেও হতে পারে। এসবই অস্থায়ী চাকরি।”

এই বিতর্ক রাজ্যের কলেজগুলিতে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে আবারও গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিল।