বোনের ‘প্রাক্তন’-কে থাপ্পড়, অপমানের প্রতিশোধে খুন? বৈদ্যবাটির ‘রহস্যমৃত্যুতে’ গ্রেপ্তার ২

হুগলির বৈদ্যবাটিতে রহস্যজনকভাবে যুগলের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনায় অবশেষে জট খুলল। শুক্রবার শ্রীরামপুর থানার পুলিশ দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে, এবং প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও প্রতিশোধের এক জটিল আখ্যান। পূর্বে পুলিশের অনুমান ছিল যে পারিবারিক কলহের জেরেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু গভীর তদন্তে তৃতীয় ব্যক্তির সম্পৃক্ততা স্পষ্ট হয়েছে।

ভয়াল সকাল ও রহস্যজনক মৃত্যু:

বৃহস্পতিবার ভোরবেলায় বৈদ্যবাটির ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সীতারাম বাগানে এক মর্মান্তিক দৃশ্য প্রতিবেশীদের ঘুম কেড়ে নেয়। আর্ত চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে এসে তাঁরা দেখেন, ঘরের বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করছেন ৩৫ বছর বয়সী মনীশ ভাদুড়ী। আর তার পাশেই নিথর, মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ৩২ বছর বয়সী অপর্ণা মাঝির প্রাণহীন দেহ। ঘরের মেঝেতে চাপ চাপ রক্তের দাগ এক ভয়াবহ ঘটনার জানান দিচ্ছিল। মনীশ দিল্লি রোডের একটি ঢালাই কারখানার কর্মী ছিলেন এবং অপর্ণা পরিচারিকার কাজ করতেন। মনীশ অবিবাহিত হলেও, অপর্ণা বিবাহিত এবং তার একটি সন্তানও আছে বলে প্রতিবেশীদের দাবি। প্রতিবেশীরা মনীশের পরিবারকে খবর দিলে তারাই শ্রীরামপুর থানায় খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শ্রীরামপুর ওয়ালশ হাসপাতালে পাঠায়। এই জোড়া মৃত্যুর ঘটনা দ্রুত রহস্যে ঘেরা হয়ে ওঠে।

তদন্তে মোড় ও সম্পর্কের জটিল জাল:

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অপর্ণার ছোট বোন রিম্পার সঙ্গে হাওড়ার চামরাইলের বাসিন্দা অর্জুন পাসওয়ানের পরিচয় হয় একটি পানশালায়। পেশায় গাড়িচালক অর্জুনের সঙ্গে রিম্পার সম্পর্ক গভীর হলে রিম্পা তার স্বামীকে ছেড়ে অর্জুনের সঙ্গে তেলেঙ্গানায় কাজে চলে যায়। তারা সেখানে কিছুদিন একসঙ্গে বসবাস করে। তিন মাস পর রিম্পা অর্জুনকে জানায় যে তাকে তার আর পছন্দ নয় এবং সে অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে। এদিকে দিদি অপর্ণাও অর্জুনকে রিম্পার সঙ্গে মেলামেশা করতে নিষেধ করেন এবং বোনকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার কথাও বলেন। এই ঘটনাই অর্জুনের মনে ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার বীজ বপন করে।

প্রতিশোধের আগুন: গ্রেপ্তার ২:

অভিযোগ উঠেছে, এরপর অর্জুন অপর্ণার বাড়িতে এসে হুমকি দিতে শুরু করে। তার এই কাজে মদত দেয় তার জামাইবাবু নাসিরুদ্দিন শেখ। পুলিশি তদন্তে আরও জানা যায়, অপর্ণা ও মনীশকে খুন করার তিন দিন আগেও অর্জুন অপর্ণার বাড়িতে এসেছিলেন। সেখানে বচসার সময় অপর্ণা অর্জুনকে চড় মেরেছিলেন। পুলিশের অনুমান, এই অপমানের বদলা নিতেই অর্জুন মনীশ ও অপর্ণাকে খুন করার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং এই কাজে তাকে সহযোগিতা করে তার জামাইবাবু নাসিরুদ্দিন।

ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান চন্দননগরের পুলিশ কমিশনার অমিত পণ্ডিত জাগলভি, ডিসি শ্রীরামপুর অর্ণব বিশ্বাস, এসিপি শুভঙ্কর বিশ্বাস এবং শ্রীরামপুর থানার আইসি সুখময় চক্রবর্তী। এরপরই অভিযুক্তদের ধরতে পুলিশ দুটো দল গঠন করে। একটি দল চামরাইলে এবং অন্য দলটি মহেশতলায় যায়। স্থানীয় পুলিশের সাহায্যে অর্জুন পাসওয়ান এবং নাসিরুদ্দিন শেখকে খুন করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ধৃতদের আজ শ্রীরামপুর আদালতে পেশ করা হবে। এই গ্রেপ্তারির ফলে বৈদ্যবাটির জোড়া খুনের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে এবং justice-এর পথে এক ধাপ অগ্রগতি হলো।