বিশেষ: মহরম কেন শোক পালনের উৎসব? জেনেনিন কবে হবে এবার জাগরণ রাত?

ইসলামিক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ‘মহরম’ মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সময়। এটি কোনো উৎসবের মাস নয়, বরং ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এই মাসটিকে শোক, আত্মত্যাগ এবং অধর্মের ওপর ধর্মের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে পালন করেন। পবিত্র কোরআনে এই মাসটিকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়েছে, এবং বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা এই মাসে নিজেদের সমস্ত আনন্দ পরিহার করে কারবালার ঐতিহাসিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা স্মরণ করেন।
‘আশুরা’ – মহরমের দশম দিনের বিশেষ মাহাত্ম্য:
আরবি শব্দ ‘মুহররম’-এর অর্থ ‘পবিত্র’। এই পবিত্র মাসের দশম দিনটি ‘আশুরা’ নামে পরিচিত, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমানরা আশুরার দিনে কারবালার সেই বিষাদময় ঘটনাকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন, যখন অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে হজরত ইমাম হুসেন (রাঃ) তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের নিয়ে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। বিশ্বাস করা হয় যে মহরম মাসেই এই ঐতিহাসিক শাহাদাতের ঘটনা ঘটেছিল। অনেক মুসলমান এই মাসে মসজিদে বিশেষ প্রার্থনা সভায় অংশ নেন এবং মহরমের নবম, দশম ও একাদশতম দিনে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোজা রাখেন।
কেন পালিত হয় মহরম?
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, ইরাকে ইয়াজিদ নামের এক নিষ্ঠুর বাদশাহ ছিলেন, যিনি নিজেকে খলিফা মনে করলেও আল্লাহর প্রতি তার কোনো বিশ্বাস ছিল না এবং তিনি মানবতাবিরোধী ছিলেন। তিনি হজরত ইমাম হুসেনকে (রাঃ) নিজের দলে যোগ দিতে বললে, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলস্বরূপ, ইয়াজিদ তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করে। কারবালার সেই যুদ্ধে হজরত ইমাম হুসেন (রাঃ), তাঁর পরিবার এবং অসংখ্য সঙ্গী শহীদ হন। এই মহরম মাসেই সেই শাহাদাতের ঘটনা ঘটেছিল বলে মনে করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকেই মহরম শোক ও ত্যাগের মাস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
মহরম ২০২৫ এর তারিখ:
মহরমের দিনক্ষণ চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে। ভারতে, গত ২৬ জুন চাঁদ দেখা গেছে এবং মসজিদ-এ-নাখোদা মারকাযী রুইয়াতে-হিলাল কমিটি ঘোষণা করেছে যে ইসলামিক নববর্ষের প্রথম দিন ২৭ জুন (শুক্রবার) থেকে শুরু হয়েছে। সেই অনুযায়ী, এবছর মহরম পালিত হবে ৬ জুলাই, রবিবার। এর পূর্বের রাত, অর্থাৎ ৫ জুলাই শনিবার পালিত হবে জাগরণ রাত।
শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের উদযাপন:
ইসলাম ধর্মের দুটি প্রধান সম্প্রদায়, শিয়া ও সুন্নি, ভিন্ন ভিন্ন প্রথা ও রীতির মাধ্যমে মহরম পালন করেন। শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমানরা মহরমের দিন কালো পোশাক পরিধান করে হজরত ইমাম হুসেন (রাঃ), তাঁর পরিবার এবং কারবালার শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। তাঁরা রাস্তায় ‘তাজিয়া’ নিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করেন এবং মহরমের নবম ও দশম দিনে রোজা রাখার পাশাপাশি বিশেষ নামাজ আদায় করেন। অন্যদিকে, সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমানরা মহরম মাসের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখার প্রথা পালন করেন।
মক্কা ও মদিনার পর ইরাকের কারবালাই মুসলিমদের কাছে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান। ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। বিশ্বাস অনুযায়ী, হজরত ইমাম হুসেন (রাঃ) মহরম মাসের দ্বিতীয় দিনে তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে কারবালায় পৌঁছেছিলেন। সেখানেই একদিন সকালে তিনি যখন নামাজ পড়ছিলেন, তখন ইয়াজিদের সৈন্যরা তীর নিক্ষেপ করা শুরু করে। এই আক্রমণে হজরত ইমাম হুসেন (রাঃ)-এর ৭২ জন সঙ্গী শাহাদাত বরণ করেন। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর থেকে মুসলিম সম্প্রদায় নববর্ষ উদযাপন বন্ধ করে মহরম মাসকে দুঃখ ও স্মরণের মাস হিসেবে পালন করে আসছেন।