কর্মীর মৃত্যুর পর PF ছাড়াও এই দাবিগুলি করতে পারেন নমিনি, জেনেনিন কী কী?

জীবনের অনিশ্চয়তা এক চরম বাস্তবতা। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম সদস্য যখন হঠাৎ চলে যান, তখন মানসিক যন্ত্রণার পাশাপাশি নেমে আসে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা। এই কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি, আর তার জন্য প্রয়োজন নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা। কর্মক্ষেত্রে কোনো কর্মচারীর আকস্মিক মৃত্যু হলে তার পরিবার (নমিনি বা আইনি উত্তরাধিকারী) কোম্পানি থেকে কী কী আর্থিক সুরক্ষা ও সুবিধা পেতে পারে, তা বিস্তারিতভাবে জেনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সংগঠিত খাতে কর্মরত যেকোনো কর্মচারীর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পর, তার পরিবার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। জেনে নিন সেই সুবিধাগুলো এবং কীভাবে তা দাবি করবেন।
১. বকেয়া বেতন ও বোনাস: শ্রমের সম্মান
কর্মচারীর মৃত্যুর আগে তার করা কাজের সম্পূর্ণ বেতন পরিবারকে দিতে কোম্পানি বাধ্য। যদি কোম্পানিতে পারফরম্যান্স-ভিত্তিক বা বার্ষিক বোনাসের কোনো বিধান থাকে, তাহলে সেই অর্থও পরিবারকে দেওয়া হবে। এই অর্থ মৃত কর্মচারীর নমিনি অথবা আইনি উত্তরাধিকারীকে হস্তান্তর করা হবে। কোম্পানি এই অর্থ দিতে অস্বীকার করতে পারে না।
২. সম্পূর্ণ প্রভিডেন্ট ফান্ড (EPF) অর্থ: সঞ্চয়ের সুরক্ষা
কর্মচারী প্রভিডেন্ট ফান্ড (EPF) হলো কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয়ের অন্যতম প্রধান অংশ। কর্মচারীর মৃত্যুর পর, তার EPF অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া সম্পূর্ণ অর্থ (কর্মচারী ও কোম্পানির উভয় অংশ) সুদসহ তার নমিনিকে প্রদান করা হয়।
- দাবি করবেন যেভাবে: যদি EPF অ্যাকাউন্টে নমিনির নাম সঠিকভাবে আপডেট করা থাকে, তাহলে অনলাইনে EPFO পোর্টালে দাবি করা যাবে। অফলাইন দাবির জন্য, ‘কম্পোজিট ক্লেম ফর্ম (মৃত্যু)’ পূরণ করে নিয়োগকর্তা কর্তৃক যাচাই করে পিএফ অফিসে জমা দিতে হবে। যদি কোনো নমিনি না থাকেন, তাহলে আইনি উত্তরাধিকারী ‘উত্তরাধিকার সার্টিফিকেট’ (Succession Certificate) দেখিয়ে দাবি করতে পারবেন।
৩. গ্র্যাচুইটির পরিমাণ: ন্যূনতম কাজ, সর্বোচ্চ সুরক্ষা
সাধারণত, গ্র্যাচুইটি পাওয়ার জন্য কর্মচারীকে একই কোম্পানিতে একটানা ৫ বছর কাজ করতে হয়। কিন্তু মৃত্যুর ক্ষেত্রে, এই ৫ বছরের শর্ত প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, একজন কর্মচারী মাত্র ১ বছর কাজ করলেও, তার পরিবার গ্র্যাচুইটি পাওয়ার অধিকারী হবে।
- গণনা পদ্ধতি: গ্র্যাচুইটি গণনা করা হয় কর্মচারীর শেষ বেতন এবং তার চাকরির সময়কালের ভিত্তিতে। এর সূত্র হল: (শেষ বেতন x ১৫/২৬ x চাকরির বছর)। কোম্পানি চাইলে আইনসম্মত ২০ লক্ষ টাকা সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে বেশি অর্থ দিতে পারে। এই অর্থও নমিনি বা আইনি উত্তরাধিকারীকে প্রদান করা হবে।
৪. কর্মচারী ডিপোজিট লিঙ্কড ইন্স্যুরেন্স (EDLI) স্কিম: বিনামূল্যে জীবন বিমা
প্রত্যেক EPF সদস্য কর্মচারী ডিপোজিট লিঙ্কড ইন্স্যুরেন্স (EDLI) প্রকল্পের অধীনে একটি জীবন বিমা কভার পান। এর জন্য কর্মচারীকে কোনো প্রিমিয়াম দিতে হয় না; নিয়োগকর্তাই এই প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন। কর্মচারীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে, তার মনোনীত ব্যক্তি এই বিমার পরিমাণ পান। এই বিমা কভারের সর্বনিম্ন পরিমাণ ২.৫ লক্ষ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭ লক্ষ টাকা, যা কর্মচারীর গত ১২ মাসের বেতনের উপর নির্ভর করে। PF দাবির সঙ্গেই EDLI-এর অর্থও দাবি করা যেতে পারে।
৫. পারিবারিক পেনশন সুবিধা (EPS): দীর্ঘমেয়াদী অবলম্বন
যদি কোনো কর্মচারী ন্যূনতম ১০ বছর ধরে কাজ করে থাকেন, তাহলে তিনি কর্মচারী পেনশন প্রকল্পের (EPS) অধীনে পেনশন পাওয়ার যোগ্য হন। তার মৃত্যুর পর, তার পরিবার এই পেনশনের সুবিধা পায়।
- কারা পেনশন পান?
- জীবনসঙ্গী: কর্মচারীর স্ত্রী বা স্বামী আজীবন পেনশন পান।
- সন্তান: দুই সন্তান ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত ২৫-২৫% পেনশন পায়। সন্তান যদি প্রতিবন্ধী হয়, তবে সে আজীবন পেনশন পেতে পারে।
- পিতামাতা: কর্মচারী অবিবাহিত হলে তার নির্ভরশীল পিতামাতারা পেনশন পান।
- নমিনি: পরিবারে কেউ না থাকলে কর্মচারীর মনোনীত ব্যক্তি পেনশন পাবেন।
এক নজরে প্রয়োজনীয় তথ্য:
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর:
-
যদি কর্মচারী কাউকে মনোনীত না করে থাকেন? যদি কোনো নমিনি না থাকে, তাহলে কর্মচারীর আইনি উত্তরাধিকারী দাবি করতে পারেন। এর জন্য আদালত থেকে একটি ‘উত্তরাধিকার সার্টিফিকেট’ (Succession Certificate) প্রয়োজন।
-
কোন কোন নথির প্রয়োজন? সাধারণত, মৃত কর্মচারীর মৃত্যু শংসাপত্র, মনোনীত বা উত্তরাধিকারীর পরিচয়পত্র (আধার, প্যান কার্ড), ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ এবং কোম্পানি কর্তৃক প্রদত্ত ফর্ম প্রয়োজন হয়।
-
দাবির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কত সময় লাগে? সাধারণত, সমস্ত নথি সঠিক থাকলে, পিএফ এবং বিমার টাকা ২০ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। গ্র্যাচুইটি এবং অন্যান্য সুবিধার জন্য কোম্পানিকে ৩০ দিনের মধ্যে অর্থ প্রদান করতে হয়।
-
এই টাকার উপর কি ট্যাক্স দিতে হয়? গ্র্যাচুইটি, পিএফ এবং EDLI বিমা থেকে প্রাপ্ত অর্থের উপর নমিনিকে কোনো কর দিতে হবে না। এই সমস্ত সুবিধা সম্পূর্ণ করমুক্ত।
-
কোম্পানি যদি দাবি পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে কী করবেন? যদি কোম্পানি গ্র্যাচুইটি বা বেতন দিতে বিলম্ব করে, তাহলে আপনি শ্রম কমিশনারের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। পিএফ এবং পেনশন সংক্রান্ত সমস্যার জন্য, আপনি EPFO অভিযোগ পোর্টালে অভিযোগ করতে পারেন।
এই তথ্যগুলো প্রত্যেক পরিবারের জন্য অত্যন্ত জরুরি, যাতে হঠাৎ দুর্যোগেও তারা সঠিক উপায়ে আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।