ডার্ক এনার্জি ও ভিনগ্রহের রহস্য খুঁজতে রওনা হচ্ছে নাসার নতুন টেলিস্কোপ, আশায় বিজ্ঞানীরা

মহাবিশ্বের দুই সবচেয়ে বড় রহস্য—ডার্ক এনার্জি ও ডার্ক ম্যাটারের সন্ধান এবং সৌরজগতের বাইরের নতুন গ্রহের খোঁজে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপে নতুন স্পেস টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণ করতে চলেছে নাসা। হাবল ও জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের উত্তরসূরি হিসেবে তৈরি প্রায় ৪০০ কোটি ডলার মূল্যের এই অত্যাধুনিক পর্যবেক্ষণাগারটি ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন হেভি’ রকেটে করে মহাকাশে পাড়ি জমাতে চলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এর প্যানোরামিক ভিউ এবং দ্রুত জরিপ চালানোর অভাবনীয় সক্ষমতা মহাবিশ্বের গঠন, বিবর্তন এবং আইনস্টাইনের অভিকর্ষ তত্ত্বকে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দেবে।

ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের মহাজাগতিক যাত্রা

নির্ধারিত সময়ের প্রায় নয় মাস আগেই ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপিত হতে চলা এই টেলিস্কোপটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়েছে নাসার প্রথম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমানের নামানুসারে। ১৯৯০ সালে পাঠানো হাবল এবং ২০২১ সালে উৎক্ষেপিত জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের সঞ্চিত জ্ঞানকে এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এই নতুন পর্যবেক্ষণাগারের।

নাসার ‘গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার’-এর জ্যেষ্ঠ প্রকল্প বিজ্ঞানী জুলি ম্যাকএনরি জানিয়েছেন, রোমানের বিস্তৃত পরিধি আমাদের মহাবিশ্বের বিচিত্র, দুর্লভ ও অদ্ভুত সব উপাদান খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। মহাকাশের বিশাল এলাকা অত্যন্ত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে জরিপ করার দারুণ ক্ষমতার সঙ্গে এর চমৎকার সংবেদনশীলতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে। টেলিস্কোপটির মূল জরিপ সম্পন্ন করতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগবে এবং এর মাধ্যমে প্রায় দুইশ কোটিরও বেশি ছায়াপথের গঠন ও বিবর্তন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করা সম্ভব হবে।

ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির চিরন্তন রহস্য

প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পর থেকেই মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হয়ে চলেছে। ১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে এই সম্প্রসারণের গতি বেড়েই চলেছে, যার নেপথ্যে রয়েছে ‘ডার্ক এনার্জি’ নামের এক অদৃশ্য শক্তি।

মহাবিশ্বের মোট উপাদানের কেবল ৫ শতাংশ হলো সাধারণ দৃশ্যমান পদার্থ (তারা, গ্রহ, গ্যাস ও ধূলিকণা)। অন্যদিকে, ছায়াপথ ও তারার ওপর অভিকর্ষের প্রভাব থেকে শনাক্ত হওয়া ডার্ক ম্যাটার রয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। আর বাকি সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৬৮ শতাংশ জুড়েই রয়েছে রহস্যময় ডার্ক এনার্জি। ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট ডালাসের বিশ্বতত্ত্ববিদ মুস্তাফা ইশাকের মতে, মূল প্রশ্ন হলো—ডার্ক এনার্জি কি সময়ের সঙ্গে অপরিবর্তিত থাকে নাকি পরিবর্তিত হয়? এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সাহায্য করবে রোমান টেলিস্কোপ।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও নতুন আবিষ্কার

১৯১৫ সালে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের প্রকাশ করা আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আজও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি। ‘গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং’ প্রযুক্তির সাহায্যে আলো কীভাবে বেঁকে যায় এবং ছায়াপথগুলো একসঙ্গে অবস্থান করে, তা চিহ্নিত করবে রোমান। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা যাচাই করে দেখতে পারবেন যে আইনস্টাইনের তত্ত্ব কোটি কোটি আলোকবর্ষ জুড়েও অপরিবর্তিতভাবে কার্যকর রয়েছে কি না।

পাশাপাশি, পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের খোঁজে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ৬ হাজার ৩৫০টিরও বেশি ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ বা বহির্গ্রহের তালিকায় আরও হাজার হাজার নতুন গ্রহ যুক্ত করার কাজে অন্যতম বড় ভূমিকা নেবে এই টেলিস্কোপ। পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬ লাখ কিলোমিটার দূরে ‘ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ২’ কক্ষপথে স্থাপন করা হতে চলা এই টেলিস্কোপটির প্রাথমিক মিশন পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারিত হলেও এর পর্যাপ্ত জ্বালানি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার পথ প্রশস্ত করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *