সিঁদুরের পর এবার দেশজুড়ে ‘অপারেশন মীরজাফর’, পাক চরদের ধরতে গোয়েন্দাদের অভিযান জোরদার, গ্রেফতার ১৪ জন

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা শত্রুদের ধরতে ‘অপারেশন মীরজাফর’ শুরু করেছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে দেশের বাইরের শত্রুদের শায়েস্তা করার পর, এবার নজর ঘোরানো হয়েছে ‘ঘর শত্রু বিভীষণ’দের দিকে। এই অভিযানের অংশ হিসেবে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে ১৪ জন পাক চরকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের সঙ্গে সরাসরি আইএসআই (ISI)-এর যোগসাজশের প্রমাণ মিলেছে। এই চরদের মাধ্যমে ভারতীয় সিম কার্ড পাকিস্তানে পাচার হচ্ছিল বলে জানা গেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে অসম পুলিশ শুরু করেছে ‘অপারেশন ঘোস্ট সিম’।
অপারেশন মীরজাফর: ‘বিভীষণ’দের চিহ্নিতকরণ
পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পরই গোয়েন্দারা ‘অপারেশন মীরজাফর’ শুরু করেন। এই অভিযানে একের পর এক ‘বিভীষণ’দের খুঁজে বের করা হচ্ছে। গোয়েন্দাদের দাবি, ভারত থেকে অনেকেই পাকিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার করেছে। দিল্লির পাকিস্তানি দূতাবাস থেকেও এই চরদের সাহায্য করা হতো। দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, জম্মু-কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ-সহ আরও কিছু রাজ্যে পাক চর সক্রিয় থাকার সন্দেহ করছেন গোয়েন্দারা।
পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে গ্রেফতার ১৪ জন চর
এখন পর্যন্ত পাঞ্জাব এবং হরিয়ানা থেকে মোট ১৪ জন পাক চরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে হরিয়ানা থেকে ছয় জন এবং পাঞ্জাব থেকে আট জন রয়েছে।
হরিয়ানা থেকে গ্রেফতারকৃতরা:
জ্যোতিরানি মালহোত্রা (হিসার): একজন ট্রাভেল ভ্লগার।
দেবেন্দ্র সিং ধিলোঁ (ক্যাথল): পাতিয়ালায় পড়াশোনা করতেন এবং ২০২৪ সালে পাকিস্তানে গিয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সংস্পর্শে আসেন।
আরমান (নুহ): ৬ মাস আগে দানিশের সংস্পর্শে আসেন এবং প্রতিরক্ষা মেলার ছবি পাকিস্তানে পাঠান।
তারিফ (নুহ): নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি ৩ বার পাকিস্তানে গিয়েছেন এবং আইএসআইকে সিরসা এয়ারফোর্স স্টেশনের ছবি পাঠিয়েছেন।
অন্য দু’জন পঞ্চকুলা থেকে গ্রেফতার।
পাঞ্জাব থেকে গ্রেফতারকৃতরা:
সুনীল কুমার (ভাতিন্ডা সেনা ছাউনি): একজন মোচি, যিনি পাকিস্তানি নারীর ‘হানিট্র্যাপে’ পড়ে গুপ্তচরবৃত্তি করছিলেন।
রকাব (ভাতিন্ডা সেনা ছাউনি): একজন দর্জি যিনি সেনাবাহিনীর পোশাক সেলাই করতেন।
পলক মসীহ এবং সুরজ মসীহ (অমৃতসর):
গাজালা এবং ইয়ামিন (মালের কোটলা): গাজালা তিনবার পাকিস্তানে গিয়েছেন এবং দানিশের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অন্যান্য গুপ্তচরদের পৌঁছে দিতেন। ইয়ামিন সরাসরি দানিশের যোগাযোগে ছিলেন।
সুখপ্রীত সিং এবং করণবীর সিং (গুরুদাসপুর): অপারেশন সিন্ধুর সম্পর্কিত অনেক গোপন তথ্য পাকিস্তানে পাঠিয়েছেন।
গোয়েন্দা কৌশল: ‘হানি ট্র্যাপ’ থেকে ‘মানি ট্র্যাপ’
গোয়েন্দাদের দাবি, ধৃতরা তাদের পাক যোগের কথা স্বীকার করেছে। তারা ভারতের বিভিন্ন বিমানঘাঁটি এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত তথ্য পাকিস্তানে পাচার করেছে এবং এর বিনিময়ে টাকা পেয়েছে। এই টাকা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতো পাঞ্জাব থেকে ধৃত গাজালা। গাজালাকে জেরা করেই ট্রাভেল ভ্লগার জ্যোতিরানি মালহোত্রার নাম উঠে আসে, যার ভিসা ২৩ এপ্রিল পাকিস্তান ইস্যু করে – পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার ঠিক পরের দিন।
সিম কার্ড জালিয়াতি: ‘অপারেশন ঘোস্ট সিম’
মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে পাক চররা পাকিস্তানে যোগাযোগ রাখত বলে জানা গেছে। এখানেই প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের সাইবার সিকিউরিটিতে কি তাহলে কোথাও ফাঁক রয়ে গেছে? এই বিষয়ে অসম পুলিশ ‘অপারেশন ঘোস্ট সিম’ শুরু করেছে, যেখানে জাল নথি দিয়ে সিম কার্ড তৈরি করে পাকিস্তানে পাচারের একটি চক্রের খোঁজ পাওয়া গেছে। এই চক্রের জাল রাজস্থান এবং তেলেঙ্গানাতেও ছড়িয়েছে।
সিম কার্ড জালিয়াতিতে জড়িত সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫ জন রাজস্থানের বাসিন্দা, একজন তেলেঙ্গানার এবং একজন অসমের বিলাসীপাড়ার বাসিন্দা। ধৃতদের কাছ থেকে প্রায় এক হাজার সিম কার্ড এবং বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন দেশের অভ্যন্তরে থাকা এই ‘ঘর শত্রু বিভীষণ’দের নির্মূল করতে এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।