“দেশপ্রেম বুজরুকি,” ভারত-পাক উত্তেজনার মাঝে বিতর্কিত মন্তব্য কবীর সুমনের

কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে নৃশংস জঙ্গি হামলার যোগ্য জবাব ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে দিয়েছে ভারত। এরপর পাকিস্তান প্রত্যাঘাতের চেষ্টা করলেও ভারতীয় বাহিনী তা সফলভাবে রুখে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গোটা দেশ যখন উত্তেজনায় ফুটছে এবং পাকিস্তানকে যোগ্য জবাব দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করছে, ঠিক তখনই ভিন্ন মত প্রকাশ করে বিতর্কের জন্ম দিলেন বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী কবীর সুমন। তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টটি রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে এবং মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
গত ৭ই মে ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে বলে ভারত দাবি করেছে। এর পাল্টা হিসেবে পাকিস্তান বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ভারতের অন্তত ১৫টি শহরকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা করেছিল বলে জানা গেছে। যদিও ভারতের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেই হামলা সফলভাবে রুখে দিয়েছে। এই লাগাতার সংঘাত এবং পাল্টা সংঘাতের আবহে গোটা দেশেই চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং জনমত পাকিস্তানকে আরও কঠোর জবাব দেওয়ার পক্ষে।
দেশের এমন এক সংবেদনশীল মুহূর্তে কবীর সুমনের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টটি অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। তিনি লিখেছেন, “আমি তো লিখেছিলাম আমার গানে গানে এই যুদ্ধ বন্ধের কথা। সেই গান আজ সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনে পড়বে।” দেশভাগ নিয়ে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি ব্যক্ত করে লিখেছেন যে, ১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ হিসেবে দেশভাগে তাঁর কোনও পছন্দ ছিল না এবং কারও অনুমতিও নেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, “দেশপ্রেম আমার কাছে একটা বুজরুকি। যেখানে মানবপ্রেম নেই, প্রাণীদের জন্য ভালোবাসা নেই, সেই দেশপ্রেম দিয়ে কী হবে?” যুদ্ধ বা সংঘাতের ফলে প্রকৃতির যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়, সেদিকে তিনি আলোকপাত করেছেন। তিনি লিখেছেন, “একটা যুদ্ধ হচ্ছে, গুলি চালানো হচ্ছে, বোমা ফেলা হচ্ছে— অথচ কতগুলো গাছ পুড়ে যাচ্ছে, প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ পাখি, পোকামাকড়। কেউ এসব নিয়ে কথা বলে না। পানি বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দেশের নেতাদের এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই।”
কবীর সুমনের এই পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ভাইরাল হয়ে গেছে এবং তাঁর মন্তব্যের পক্ষে ও বিপক্ষে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। নেটিজেনদের একাংশ মনে করছেন, কবীর সুমন একেবারে সঠিক কথা বলেছেন। তাঁরা মনে করেন, এই সমস্ত আক্রমণ, প্রত্যাঘাত বা মিসাইল নিক্ষেপে প্রকৃতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বেশিরভাগ মানুষ বা কর্তৃপক্ষ ভাবছেন না। অনেকেই প্রতিবেশী দেশকে ‘সবক শেখানো’র আগ্রাসী মনোভাবের সমালোচনা করছেন।
অন্যদিকে, নেটিজেনদের একটি বড় অংশ কবীর সুমনের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করছেন। তাঁদের মতে, দেশের এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে এই ধরণের কথা সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে পারে। তাঁদের বক্তব্য, এই সময়ে দেশের সুরক্ষায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানানো এবং তাঁদের আত্মত্যাগের জন্য গর্ব করা উচিত। এমন মন্তব্য করা উচিত নয় যা তাঁদের হতাশ করে।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তান যে ১৫টি শহরকে টার্গেট করেছিল বলে ভারত সরকার জানিয়েছে, সেগুলির মধ্যে রয়েছে শ্রীনগর, অমৃতসর, পাঠানকোট, জলন্ধর, চণ্ডীগড়, লুধিয়ানা, অবন্তীপোরা, জম্মু, ভাটিন্ডা, কাপুরথালা, আদমপুর, ভুজ সহ আরও কয়েকটি শহর। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সতর্ক থাকায় পাকিস্তানের এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই কবীর সুমনের মতো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির ভিন্ন সুর দেশের ভেতরের মতানৈক্যকেও স্পষ্ট করে তুলেছে।