‘অপারেশন সিঁদুর’-এ মূল অস্ত্র ছিল ‘আত্মঘাতী’ LMS ড্রোন, জেনেনিন এই বিধ্বংসী অস্ত্রের ক্ষমতা ?

ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানে আধুনিক যুদ্ধ কৌশলের এক নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীর (POK) সহ মোট ৯টি নির্দিষ্ট জঙ্গি ঘাঁটিতে হামলা চালানোর এই অভিযানে ভারতীয় বাহিনী অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়েছে। এই অভিযানের অন্যতম প্রধান এবং বিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ছোট আকারের কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর LMS ড্রোন, যা ‘আত্মঘাতী ড্রোন’ নামেও পরিচিত।
এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তিনটি শাখা—বায়ুসেনা, স্থলসেনা এবং নৌসেনা একসঙ্গে সমন্বিতভাবে অংশ নেয়। মূল আক্রমণাত্মক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় LMS বা Loitering Munition System ড্রোন। এই ড্রোনগুলির বিশেষত্ব হলো, এরা লক্ষ্যবস্তুর উপর আছড়ে পড়ে নিজেদের বিষ্ফোরণের মাধ্যমে তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। লো-লেভেল ফ্লাইটের মাধ্যমে অত্যাধুনিক রাডারকেও ফাঁকি দিয়ে এরা নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে পারে।
কী এই LMS ড্রোন?
LMS ড্রোনের পূর্ণ রূপ হলো Low-cost Miniature Swarm Drone বা Loitering Munition System। এগুলি মূলত সস্তা, ছোট আকারের এবং অত্যন্ত উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন আত্মঘাতী ড্রোন, যা দীর্ঘক্ষণ আকাশে ঘোরাফেরা বা ‘loiter’ করতে পারে। এরা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করে এবং তারপর সেই লক্ষ্যবস্তুর উপর সরাসরি আঘাত হেনে বিস্ফোরণ ঘটায়।
কেন এগুলিকে আত্মঘাতী ড্রোন বলা হয়?
এই ড্রোনগুলি একবার লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান শনাক্ত করলে, ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বিষ্ফোরক ছুড়ে দেওয়ার বদলে নিজের দেহ দিয়েই লক্ষ্যবস্তুর উপর আঘাত হেনে বিস্ফোরণ ঘটায়। এই কারণে এগুলিকে ‘আত্মঘাতী ড্রোন’ বলা হয়। অস্ত্রের ডিপো, রাডার স্থাপনা, কমান্ড সেন্টার এবং সুরক্ষিত জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংসে এই ধরনের ড্রোন অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়।
কীভাবে কাজ করে এই ড্রোন?
LMS ড্রোনগুলি অনেক সময় ‘Swarm Technology’ ব্যবহার করে। এর অর্থ হলো, একাধিক ড্রোন একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে। একাধিক ড্রোন যখন বিভিন্ন কোণ থেকে একসঙ্গে আক্রমণ চালায়, তখন শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের রাডারকে ফাঁকি দেওয়া অনেক সহজ হয়, যার ফলে আক্রমণ আরও কার্যকর হয়।
ভারতেই তৈরি এই অত্যাধুনিক অস্ত্র
এই LMS ড্রোনগুলি ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) এবং দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা যৌথভাবে এগুলি তৈরি করেছে। এতে রয়েছে হাই রেজোলিউশন ক্যামেরা, থার্মাল ইমেজিং ক্ষমতা, নির্ভুল জিপিএস নেভিগেশন ব্যবস্থা, এবং কিছু উন্নত মডেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তিও যুক্ত করা হয়েছে। লক্ষ্যবস্তু নির্ভুলভাবে চিহ্নিত ও ট্র্যাক করার জন্য ন্যাশনাল টেকনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (NTRO) গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছে।
ছোট আকার, বড় ধ্বংস ক্ষমতা
এই ড্রোনগুলির গতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০ মাইলের কাছাকাছি হলেও, এদের মূল সুবিধা হলো এদের ছোট আকার। এই ছোট আকৃতির কারণে এগুলি শত্রুপক্ষের চোখকে সহজেই ফাঁকি দিতে পারে এবং হঠাৎ আক্রমণে সম্পূর্ণভাবে অবাক করে দিতে সক্ষম। মাত্র কয়েক ফুট দৈর্ঘ্যের এই ড্রোনগুলি যেকোনো জায়গা থেকে সহজে উৎক্ষেপণ করা যায় এবং এগুলি আকাশপথে প্রায় নিঃশব্দে ঘোরাফেরা করতে পারে, যা এদের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এ এই অত্যাধুনিক আত্মঘাতী ড্রোনের সফল ব্যবহারের মাধ্যমে ভারত বিশ্বকে দেখিয়ে দিল যে ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র কেবল সাহস ও শক্তির নয়, প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বেরও খেলা। পাকিস্তানে এই হামলার পরে, এটি স্পষ্ট যে ভারত আর কেবল কূটনৈতিক আলোচনার স্তরে সীমাবদ্ধ নেই—প্রয়োজনে প্রযুক্তির আগুনেই দায়ীদের জবাব দিতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।