“সন্ত্রাসীদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে”-‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সাফল্য নিয়ে বার্তা দুই মহিলা সেনা অফিসারের

ভারতীয় সেনার মধ্যরাতের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ মাত্র ২৫ মিনিটে পাকিস্তানের ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি এবং তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই হামলায় প্রায় ৯০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। বুধবার সকাল ১০টায় একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে অভিযানের সফলতার প্রমাণ হিসেবে গুঁড়িয়ে যাওয়া পাক জঙ্গিঘাঁটিগুলির ভিডিয়োও দেখানো হয়, যা পাকিস্তানের আসল চেহারা উন্মোচন করেছে।
বুধবার সকাল ১০টায় আয়োজিত এই সাংবাদিক সম্মেলনে ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রি, ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল সোফিয়া কুরেশি এবং ভারতীয় বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিং উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা যৌথভাবে এই অভিযানের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন এবং অভিযানের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে দুই মহিলা সামরিক কর্মকর্তার উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
বিদেশ সচিবের বার্তা: পহেলগাঁও হামলার জবাব, পাকিস্তান জঙ্গিদের আশ্রয়দাতা
বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রি বলেন, মুম্বই হামলার পর পহেলগামে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলা হয়েছে। এই হামলার মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের উন্নয়ন থমকে দেওয়া এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা ভারত সরকার এবং দেশের নাগরিকদের সচেতনতার কারণে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি জানান, পহেলগাম হামলায় পাক জঙ্গি গোষ্ঠী TRF-এর যোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং জঙ্গিদের আশ্রয়দাতা হিসাবে পাকিস্তান গোটা বিশ্বে পরিচিত। বিদেশ সচিবের কথায়, ‘পহেলগামে হামলার পর গোটা দেশে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল। ভারত ১৫ দিন ধরে অপেক্ষা করেছে, কিন্তু পাকিস্তান জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করেনি। তাই মঙ্গলবার ভোর রাতে পাক জঙ্গিঘাঁটিতে নিয়ন্ত্রিত হামলা চালানো হয়েছে।’ তিনি জানান, জঙ্গিদের যথাযথ জবাব দিতে ভারত নিজের শক্তি প্রয়োগ করেছে এবং এটি ছিল সুচিন্তিত এবং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ, কোনো উস্কানিমূলক হামলা নয়।
কর্নেল সোফিয়া কুরেশি ও উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা
কর্নেল সোফিয়া কুরেশি অভিযানের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তিনি দাবি করেন, ঠিক রাত ১টা ৫ মিনিট থেকে দেড়টার মধ্যে, অর্থাৎ মাত্র ২৫ মিনিটে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলে। তিনি বলেন, পহেলগামে নিহত নিরপরাধ মানুষদের ন্যায়বিচার দিতেই এই অপারেশন চালানো হয়েছে। বিশ্বস্ত ইন্টেলিজেন্স খবরের নিরিখেই এই অভিযান চলেছে এবং ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি ধূলিসাৎ করা হয়েছে। কর্নেল সোফিয়া এবং উইং কমান্ডার ব্যোমিকা পাকিস্তানের মাটিতে তিন দশক ধরে গড়ে ওঠা জঙ্গি পরিকাঠামোর বিস্তারিত তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরে জঙ্গিঘাঁটি, জঙ্গি প্রশিক্ষণের জায়গা, হ্যান্ডলারদের লঞ্চ প্যাড সবই রয়েছে এবং পাকিস্তান পরিকল্পিতভাবে এটিকে তৈরি করেছে।
যে সমস্ত ঘাঁটি ধুলিসাৎ হয়েছে:
অভিযানে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি ঘাঁটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বাহাওয়ালপুরের জইশ-ই-মহম্মদের সদরঘাঁটি, যা জঙ্গিদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ সবই চলত। মুরিদকে লস্কর-ই-তৈবার ঘাঁটি ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র, যেখানে আজমল কাসভ এবং ডেভিড হেডলির মতো জঙ্গিরা প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, সেটিও দুরমুশ করা হয়েছে। কোটলিতে আত্মঘাতী জঙ্গি ও অনুপ্রবেশ প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং মুজাফফরাবাদের শাওয়াই নাল্লায় লস্কর-ই-তৈবার ট্রেনিং সেন্টারও উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে সোনমার্গ, গুলমার্গ, পহেলগামে হামলার চক্রীরা প্রশিক্ষণ নিত। এছাড়াও সইদ-না-বিলাল ক্যাম্প (জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটি), কোটলির গুলপুর ক্যাম্প (লস্কর-ই-তৈবার বেস, পুঞ্চ ও তীর্থযাত্রীদের বাসে হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ দিত), ভিমবেরের বরনালা ক্যাম্প, কোটলির আব্বাস ক্যাম্প এবং শিয়ালকোটের কাছে মেহমুনাতে হিজবুল মুজাহিদিনের অস্ত্রাগারও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বেসামরিক বা সেনাঘাঁটিকে নিশানা করা হয়নি:
কর্নেল সোফিয়া এবং উইং কমান্ডার ব্যোমিকা জোর দিয়ে বলেন যে, এই অভিযানে একজনও নির্দোষ, সাধারণ মানুষের যাতে ক্ষতি না হয়, সে দিকে সর্বোচ্চ নজর দেওয়া হয়েছে। কর্নেল সোফিয়া স্পষ্ট জানান, একটি পাক সেনা ঘাঁটিকেও নিশানা করা হয়নি এবং কোনও নাগরিকেরও ক্ষতি হয়নি। বায়ুসেনার মহিলা আধিকারিকরা বলেন, নির্দিষ্ট ভাবে কিছু বিল্ডিংয়ে হামলা হয়েছে, সেনাঘাঁটিতে কোনও হামলা হয়নি। প্রযুক্তির সাহায্যে ওই ভবনগুলি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে পার্শ্ববর্তী এলাকার কোনো ক্ষতি না হয়।
কর্নেল সোফিয়া শেষে পাকিস্তানের উদ্দেশে সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তান যদি কিছু করার সাহস করে, তাহলে তাকে উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। ভারতীয় সেনার এই সাংবাদিক সম্মেলন ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর দ্রুততা, নির্ভুলতা এবং লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ভারত সন্ত্রাসবাদ দমনে কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং প্রয়োজনে সীমিত সময়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে কতটা সক্ষম। বেসামরিক নাগরিক এবং সামরিক স্থাপনা এড়িয়ে শুধুমাত্র জঙ্গি পরিকাঠামো ধ্বংস করার বিষয়টি ভারতকে আন্তর্জাতিক মহলে এক দৃঢ় অবস্থানে স্থাপন করবে।