ভারতের জল যুদ্ধের পাল্টা জবাব পাকিস্তানের, স্থগিত করলো সিমলা চুক্তি

জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরনে সন্ত্রাসী হামলা (Pahalgam Terrorist Attack) এবং তাতে প্রায় ২৫ জন পর্যটক ও এক কাশ্মীরি সহিসের প্রাণহানির পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সীমান্তে সন্ত্রাস ছড়ানোর অভিযোগে ভারত দশক পুরনো সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিলে পাকিস্তানে ‘জল কষ্টের’ আশঙ্কা দেখা দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের ভারত-বিরোধী মনোভাব প্রকাশ পায় এবং তারা ‘শান্তিভঙ্গের’ সিদ্ধান্ত নেয়, যা শিমলা চুক্তি স্থগিতের মধ্যে দিয়ে সামনে আসে।
গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানে পহেলগাঁও হামলা নিয়ে আলোচনার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির একটি বৈঠক বসে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকের পরই পাকিস্তান ১৯৭২ সালের শিমলা চুক্তি স্থগিত করার কথা ঘোষণা করে। কিন্তু কী ছিল এই চুক্তি এবং এর মাধ্যমে পাকিস্তান কীভাবে শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করতে পারে? আদৌ কি এতে ভারতের কোনো বিপদ হতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে প্রথমে শিমলা চুক্তি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। এটি এমন একটি চুক্তি যা পাকিস্তানের জন্য একধরনের ‘অপমানের’ ইতিহাস বহন করে। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে এবং একটি নতুন দেশ, বাংলাদেশের জন্ম হয়। এরপর ১৯৭২ সালের ২ জুলাই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমেই জম্মু-কাশ্মীরে নিয়ন্ত্রণ রেখা (Line of Control) নির্ধারিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণ পাকিস্তানের মনকে প্রথম থেকেই তিক্ত করে তুলেছিল, আর তার উপর এমন পরাজয়, যার ফলে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি জওয়ান ও আধিকারিককে ভারতের সামনে আত্মসমর্পণ করতে হয়। এই ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আরও বাড়বে বলেই মনে করা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সেই আবহাওয়াকে প্রশমিত করতেই শিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যেকার সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন এবং সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি কোনো পক্ষই সেনা মোতায়েন করবে না। অথচ গত বৃহস্পতিবার উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তান সেই চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে পাকিস্তান কর্তৃক চুক্তি ভঙ্গ এটিই প্রথম নয়। ১৯৭২ সালের পর থেকে বেশ কয়েকবার তারা এই চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। বিভিন্ন সময়ে সীমান্তে সন্ত্রাসবাদকে উস্কানি দিয়ে তারা এই চুক্তি ভঙ্গ করেছে। এমনকি, পাকিস্তানের বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিজেও সম্প্রতি একটি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে গত তিন দশক ধরে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদে মদত জুগিয়েছে।
এই চুক্তি বাতিলের সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে? একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, ইসলামাবাদ ঢাকঢোল পিটিয়ে শিমলা চুক্তি স্থগিতের কথা বললেও, এই সংক্রান্ত কোনো সরকারি ঘোষণাপত্র এখনও পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে এসে পৌঁছায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি স্থগিত করার মাধ্যমে পাকিস্তান আসলে ভারতকে একটি বার্তা বা সতর্কতা দিতে চাইছে। পাকিস্তানের মতে, এই চুক্তি না থাকলে ভারতীয় কাশ্মীর এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্যে কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত নেই। সুতরাং, সুযোগ বুঝে তারা ভারতের দিকে অনুপ্রবেশ বা হামলা চালানোর চেষ্টা করতে পারে।
কিন্তু এতে কি ভারত চাপে পড়বে? ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, পাকিস্তানের সেই ক্ষমতা নেই। তাদের শুধু মুখে বড় বড় কথা, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। ঢাল-তলোয়ারহীন অবস্থায় তারা যেন ফাঁকা কলসির মতোই আওয়াজ করছে। বর্তমানে সামরিক শক্তি ও পুলিশের নিরিখে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রেও অনেক এগিয়ে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যতই চুক্তি স্থগিত করুক না কেন, ভারতের উপর এর বিশেষ কোনো প্রভাব পড়বে না। এমনকি কাশ্মীরেও সেনাবাহিনী পুনরায় আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়েছে এবং জঙ্গিদের দেখলেই নির্মূল করছে।