বিশেষ: হাতের ফোনই যখন সবচেয়ে আপন, স্ক্রিন টাইম বাড়াচ্ছে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা?

সকালের ঘুম ভাঙতেই সবার আগে মুঠোফোনে চোখ, সারাদিন সামাজিক মাধ্যমের endless scrolling আর রাতে শুতে যাওয়ার আগেও স্ক্রিনের নীল আলো – প্রযুক্তির এই অতিনির্ভরতা আমাদের জীবনে একদিকে যেমন এনেছে সুবিধা, তেমনই অন্যদিকে নিঃশব্দে কেড়ে নিচ্ছে মানসিক প্রশান্তি, ঠেলে দিচ্ছে উদ্বেগ আর বিষণ্ণতার দিকে। কাজের চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা আর সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে, অনেক ক্ষেত্রেই কৃত্রিম জীবনযাপন আমাদের এক অদৃশ্য মানসিক প্রতিযোগিতার মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি ৮ জনের মধ্যে ১ জন মানুষ কোনো না কোনো মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন, যার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তরুণ প্রজন্ম। ২০১৯ সালে জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (JAMA Pediatrics) প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, দিনে সাত ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনে ব্যয় করলে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়।

টরন্টো ইউনিভার্সিটির ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট ড. লরা ম্যাকনাইট মনে করেন, যখন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাত্রা আমাদের ব্যক্তিগত সময়, পর্যাপ্ত ঘুম, জরুরি সম্পর্ক স্থাপন কিংবা নিজের প্রতি যত্নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখনই তা মানসিক চাপের মূল কারণ হয়ে ওঠে।

সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের আপাতদৃষ্টিতে নিখুঁত ও আনন্দময় জীবন দেখে অনেকে নিজের জীবনকে তার সঙ্গে তুলনা করে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। সবাই ঘুরছে, খাচ্ছে, হাসছে দেখে নিজের জীবনটাকে ফাঁকা মনে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (CDC) জানিয়েছে, এই ‘কম্প্যারেটিভ লাইফস্টাইল’ তরুণদের মধ্যে একাকিত্ব, হীনম্মন্যতা এবং কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়িয়ে তুলছে। সিডিসি ইয়ুথ রিস্ক বিহেভিয়ার সার্ভের (CDC Youth Risk Behavior Survey) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে তিন ঘণ্টার বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক চাপের ঝুঁকি প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

তবে প্রযুক্তি সবসময়েই ক্ষতিকর নয়; সঠিক ও সচেতন ব্যবহারে এটি মানসিক শান্তির মাধ্যমও হতে পারে। বর্তমানে Headspace, Calm, Insight Timer, Medito-র মতো বিভিন্ন মেডিটেশন অ্যাপ মানসিক প্রশান্তি অর্জনে চমৎকারভাবে সাহায্য করে। এছাড়াও অনলাইন থেরাপি, কাউন্সেলিং সেশন এবং সাপোর্ট গ্রুপ প্রযুক্তির মাধ্যমেই মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান করছে।

প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাঁচতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা জরুরি। প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকুন। ঘুমাতে যাওয়ার কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে ফোন বা অন্য কোনো গ্যাজেট ব্যবহার বন্ধ করুন। আপনার প্রতিদিনের স্ক্রিন টাইম কত, তা মনিটর করুন এবং নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপ ব্যবহারের সময় সীমিত করুন। পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সময় ফোন বা ল্যাপটপ দূরে রাখুন। ছুটির দিনে প্রকৃতির সান্নিধ্যে বা শারীরিক কার্যকলাপে সময় কাটান।

প্রযুক্তি এখন আমাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই প্রযুক্তিকে যদি আমরা সঠিক উপায়ে নিয়ন্ত্রণ না করি, তবে তা একসময় আমাদের নিজেদের জীবন, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার হোক সচেতন, সংযত এবং আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক।