“প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙে আতঙ্কে, কী ভাবে…?”-সুপ্রিম রায়ে স্বপ্নভঙ্গ, ধর্নায় চাকরিহারা শিক্ষকরা

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে তাঁদের। আদালতের নির্দেশে আচমকা চাকরি হারানোর পর নিজেদের যন্ত্রণার কথা জানাতে কলকাতা থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দেশের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে ধর্নায় বসলেন চাকরিহারা ‘যোগ্য’ শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

সোমবার কলকাতার ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেল থেকে বাসে করে রওনা দেন এই শিক্ষকরা। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বুধবার সকালে দিল্লি পৌঁছয় সেই বাস। এদিন দুপুর দুটো থেকে যন্তর মন্তরে শুরু হয় তাঁদের ধর্না। কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবে বিকেলে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর অফিসে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন তাঁরা। বুধবার রাতেই অবশ্য বেশিরভাগ শিক্ষক দিল্লি থেকে রওনা দিয়েছেন কলকাতার দিকে। তবে কয়েকজন শিক্ষক দিল্লিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আগামী কয়েকদিন ধরে তাঁরা দিল্লির বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে সেখানকার ছাত্র ও শিক্ষকদের কাছে নিজেদের কষ্টের কথা তুলে ধরার পরিকল্পনা নিয়েছেন। এছাড়াও, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে নিজেদের আর্জি জানানোর চেষ্টা করবেন তাঁরা। চাকরি ফিরে পাওয়াই তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য। এদিন যখন দিল্লিতে এই ধর্না চলছিল, ঠিক সেই সময়ে কলকাতার ওয়াই চ্যানেলেও অবস্থানে শামিল হন এই কর্মহারা শিক্ষকদের অন্যান্য সহকর্মীরা। সেখানেও ধর্না-অবস্থান থেকে নিজেদের হকের চাকরি ফেরত দেওয়ার জোরালো দাবি ওঠে।

দিল্লির তীব্র গরমে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি কতটা কঠিন ছিল, তা বোঝাতে গিয়ে একটু থামলেন কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা, চাকরিহারা শিক্ষিকা অনিন্দিতা চৌধুরী। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অনিন্দিতা এবং তাঁর স্বামী দু’জনেই চাকরি হারিয়েছেন। অনিন্দিতা শিক্ষকতা করতেন সত্যনারায়ণ গার্লস হাইস্কুলে এবং তাঁর স্বামী ছিলেন নবদ্বীপের ভালুকা হাইস্কুলের শিক্ষক। তাঁদের ছয় বছরের একটি সন্তান রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা দিশাহারা।

অনিন্দিতার প্রশ্ন, “প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙে আতঙ্কে, কী ভাবে ছেলের জন্য খাবার জোগাব? কী ভাবে ওর পড়াশোনা চলবে? আমরা চাই, আদালতে উপযুক্ত তথ্য জমা দিয়ে রাজ্য সরকার আমাদের চাকরি ফেরাক। অন্তত আমাদের সন্তান ও পরিজনের দিকে তাকিয়ে এই পদক্ষেপ হোক দ্রুত।” যন্তর মন্তরের ধর্নায় অংশ নেওয়া চাকরিহারা শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডল বলেন, “আমরা কোনও অপরাধ করিনি। তবু আমাদের শাস্তি পেতে হচ্ছে। যারা টাকা নিয়ে চাকরি দিয়েছে, যারা নিয়ম ভেঙেছে, তাদের শাস্তি হোক। এটাই আমরা চাই।”

এদিকে কলকাতাতেও ধর্না মঞ্চে উচ্চ স্বরে স্লোগান চলছিল। কেন দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের বাঁচিয়ে সাধারণ ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের চাকরি কেড়ে নেওয়া হলো—এই প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি ‘ভলান্টারি’ শিক্ষকতা না করার কথাও জানান আন্দোলনকারীরা। ধর্না থেকে চাকরিহারা শিক্ষক ওবাইদুর রহমান বলেন, “বিচারপতি থেকে নেতা—অনেকের বাড়িতেই বান্ডিল বান্ডিল নোট মেলে। তাঁরা কিন্তু ছাড় পেয়ে যান, তাঁদের বিচার হয় না। আর আমাদের বিচারের নামে প্রহসন হয়েছে। এরপরে কী ভাবে ন্যায়শিক্ষা দেব পড়ুয়াদের?” আজ এই শিক্ষকরা সকলে সুপ্রিম কোর্টের দিকেই তাকিয়ে, যদি কোনও সামান্য আশার আলো দেখা যায়!