“লন্ডভন্ড আগে দেখি নাই, বলি ২৬ হাজার চাকরি গেল ঘুষের দায়…” চাকরিহারাদের দুঃখে রায়গঞ্জের বাউলের গান

“এমন আজব কাণ্ড, লন্ডভন্ড আগে দেখি নাই, বলি ২৬ হাজার চাকরি গেল ঘুষের দায়…” – উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের কাশিবাটি এলাকার পথে-ঘাটে কান পাতলেই এখন ভেসে আসছে এই মর্মস্পর্শী লোকগান। এই গানের স্রষ্টা ও শিল্পী তরণিমোহন বিশ্বাস, যিনি উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতিতে একজন জনপ্রিয় বাউল হিসেবে পরিচিত। গানের প্রতিটি পংক্তি যেন চাকরিহারা শিক্ষকদের বেদনার প্রতিচ্ছবি।
সম্প্রতি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১৬ সালের এসএসসি-র পুরো প্যানেল বাতিল হয়ে যাওয়ায় রাজ্যের প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী কর্মহীন হয়েছেন। যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের চাকরি হারানোর এই ঘটনা রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। একসময়ের চক-ডাস্টার হাতে নেওয়া শিক্ষকেরা আজ নিজেদের অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন।
সেই অধিকারের লড়াইয়ে কসবা ডিআই অফিসের সামনে পুলিশের ‘লাথি’ ও লাঠিচার্জের ঘটনা রায়গঞ্জের বাউল শিল্পী তরণিমোহনকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। এই অমানবিক দৃশ্য দেখে আর স্থির থাকতে পারেননি এই সংবেদনশীল শিল্পী। তাই নিজের দুঃখ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তাঁর বাউল গানের মাধ্যমে। এর আগেও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে গান বেঁধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তরণিমোহন। এবার রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্রের এই অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়েও তিনি নীরব থাকতে পারলেন না।
ভোটের সময় শান্তি রক্ষার বার্তা হোক কিংবা বাংলাদেশের ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে প্রতিবাদের সুর, গানকে হাতিয়ার করে বারবার পথে নেমেছেন তরণিমোহন বিশ্বাস। রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্রে যখন এত বড় ধাক্কা, তখন একজন শিল্পী হিসেবে তিনি ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তাই বাঁধলেন এই গান, যার প্রতিটি ছত্রে চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অশিক্ষক কর্মীদের জন্য গভীর সমবেদনা ফুটে উঠেছে।
বাউল শিল্পী তরণিমোহন বিশ্বাস বলেন, “এই গানটা বাঁধার মূল কারণ হল পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতি। এত সংখ্যক শিক্ষকের চাকরি চলে যাওয়া আমাকে মানসিকভাবে খুব আঘাত দিয়েছে। ছোটবেলা থেকে বহু কষ্টে পড়াশোনা করে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁরা। সেই স্বপ্ন পূরণও হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সরকারের ভুল পদক্ষেপে চোখের পলকেই রাজ্যের এত শিক্ষকের চাকরি চলে গেল। গোটা রাজ্যে কান্নার রোল উঠেছে। এমন ঘটনা দেখে কোনও লোকশিল্পী কি চুপ থাকতে পারে? তাই একজন সাধারণ লোকশিল্পী হিসেবে আমি এই ঘটনার নীরব দর্শক হতে পারিনি।”
তরণিমোহনের এই গান শুধু একটি প্রতিবাদের ভাষা নয়, এটি সেই সকল শিক্ষকদের প্রতি সহানুভূতির প্রকাশ, যাঁরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার হারিয়ে আজ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে। লোকগানের এই শক্তিশালী মাধ্যম ফের একবার সমাজের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরল, যা হয়তো বহু হৃদয়কে নাড়া দেবে।