ফাইটার জেট থেকে মিসাইল, মার্কিন অস্ত্র বানানোর কৌশল চিনের হাতে; মহাবিপদে ট্রাম্প?

ওয়াশিংটন: আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশ্ব রাজনীতির বাজারে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে ‘রেয়ার আর্থ’ (Rare Earth) বা দুর্লভ মৃত্তিকা খনিজ। এই খনিজের প্রক্রিয়াকরণ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে চিন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে থাকায় আমেরিকা ও চিনের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে চিন যখন বেশ কিছু রেয়ার আর্থ ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের রফতানির উপর বিধিনিষেধ আরও কঠোর করে, তখন থেকেই মার্কিন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রেয়ার আর্থ আসলে কী এবং এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
রেয়ার আর্থ হলো পর্যায় সারণীর ১৭টি আলাদা খনিজ উপাদানের একটি বিশেষ গোষ্ঠী। এই উপাদানগুলির সাহায্যে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্থায়ী ম্যাগনেট বা চুম্বক তৈরি করা হয়, যা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মোটর ও যন্ত্রাংশে অপরিহার্য।
মোবাইল ফোন বা সাধারণ ইলেকট্রনিক্স ছাড়াও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে রেয়ার আর্থের গুরুত্ব অপরিসীম। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের তথ্য অনুযায়ী—
-
F-35 যুদ্ধবিমান
-
মিসাইল ও ড্রোন
-
সাবমেরিন এবং রাডার সিস্টেম—এই সমস্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল সামরিক সরঞ্জামে রেয়ার আর্থ দিয়ে তৈরি বিশেষ ম্যাগনেট ব্যবহার করা হয়।
ফলস্বরূপ, দীর্ঘমেয়াদে এই খনিজের সরবরাহ ব্যাহত হলে নতুন সামরিক অস্ত্র উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে চিন সরবরাহ বন্ধ করলেই আমেরিকার সমস্ত যুদ্ধবিমান রাতারাতি আকাশে ওড়া বন্ধ করে দেবে; আসল সংকট লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সাপ্লাই চেনের অনিশ্চয়তায়।
রেয়ার আর্থে চিনের একচ্ছত্র আধিপত্য কোথায়?
বিশ্বের বাজারে রেয়ার আর্থের কেবল খনিজ উত্তোলনেই নয়, বরং তা পরিশোধন (Refining), আলাদা করা এবং সেখান থেকে উন্নতমানের ম্যাগনেট তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় চিন এক নম্বরে রয়েছে।
-
বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ রেয়ার আর্থ প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা আজ চিনের মুঠোয়।
-
২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে আমেরিকায় যত রেয়ার আর্থ আমদানি হয়েছে, তার প্রায় ৭৫ শতাংশই এসেছে চিন থেকে।
আমেরিকার নিজস্ব ভূখণ্ডেও রেয়ার আর্থের খনি রয়েছে (যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন পাস মাইন), কিন্তু খনিজ তুলে তা থেকে ম্যাগনেট তৈরির পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত ক্ষমতা চিনের তুলনায় আমেরিকার অনেক কম। আর এই কারণেই ওয়াশিংটনকে সবসময় বেজিংয়ের উপর নির্ভর থাকতে হয়।
চিন নির্ভরতা কমাতে কী করছে আমেরিকা?
চিনের এই একচেটিয়া আধিপত্য ও ব্ল্যাকমেলের সম্ভাবনা এড়াতে আমেরিকা এখন কোমর বেঁধে নেমেছে। নিজেদের দেশে সম্পূর্ণ দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain) গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে ওয়াশিংটন।
২০২০ সাল থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর দেশে রেয়ার আর্থের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ বাড়াতে ৪৩৯ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি আর্থিক অনুদান দিয়েছে। আমেরিকার মূল লক্ষ্য হলো—খনি থেকে খনিজ তোলা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ম্যাগনেট তৈরি—পুরো প্রক্রিয়াটি নিজেদের দেশের মাটিতেই সম্পন্ন করা।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, রেয়ার আর্থের বাজারে চিনের শক্ত নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার সামরিক ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হলেও, চিন একঝটকায় আমেরিকা তথা পশ্চিমা বিশ্বকে অচল করে দিতে পারবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় বিকল্প পথ খুঁজতেই এখন ব্যস্ত মার্কিন প্রশাসন।