মুর্শিদাবাদের হিংসায় ৩ জনের মৃত্যু, আদালতের নির্দেশে টহল দিচ্ছে ১,৬০০ জওয়ান

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় ওয়াকফ আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ক্রমশ হিংসাত্মক রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পাথর ছোড়া, অগ্নিসংযোগ এবং অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষোভের জেরে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে, সরকারি অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ কর্মীরাও।
এই সহিংসতায় এখনও পর্যন্ত তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। শনিবার দুপুরে সামশেরগঞ্জের জাফরাবাদে এক মর্মান্তিক ঘটনায় বাবা ও ছেলেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহতরা হলেন হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর ছেলে চন্দন দাস। পরিবারের অভিযোগ, হামলাকারীরা প্রথমে বাড়িতে লুটপাট চালায় এবং পরে তাঁদের নৃশংসভাবে খুন করে। পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে এবং পরিবার ও স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
অন্যদিকে, শুক্রবার সুতির সাজুর মোড়ে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ ২১ বছর বয়সী ইজাজ আহমেদ শনিবার সন্ধ্যায় মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
পিটিআই সূত্রে খবর, ধূলিয়ানে একটি বিড়ি কারখানার দুই শ্রমিক, গোলাম মঈনুদ্দিন শেখ ও আরও একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তাঁদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং তাঁরা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় দফায় দফায় রুট মার্চ ও টহল চালাচ্ছে পুলিশ। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ১৫০ জনের বেশি অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে কোনও রকম গুজবে কান না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
এই ভয়াবহ হিংসার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব রাজ্যের মুখ্যসচিব ও ডিজিপির সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে আলোচনা করেছেন। ডিজিপি দাবি করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে এখনও থমথমে। স্থানীয়ভাবে মোতায়েন বিএসএফের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
রাজ্য সরকারের অনুরোধে কেন্দ্র থেকে অতিরিক্ত পাঁচ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে মুর্শিদাবাদের হিংসাগ্রস্ত এলাকায় মোট ১৬ কোম্পানি, অর্থাৎ ১৬০০ জন জওয়ান মোতায়েন করা হবে।
রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস জানিয়েছেন, কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে মুর্শিদাবাদ-সহ রাজ্যের বিভিন্ন হিংসাগ্রস্ত এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, এই বিষয়ে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং হাইকোর্টের সময়োচিত হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, ‘ওয়াকফ আইন বাংলায় কার্যকর হবে না।’ তিনি বলেন, ‘এই আইন কেন্দ্রের, আমাদের নয়। আমাদের সরকার এই আইনের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখে না।’ মুখ্যমন্ত্রী সকলকে শান্তি বজায় রাখার জন্য আবেদন জানিয়েছেন।
হিংসার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুতির সাজুর মোড় ও শমশেরগঞ্জ এলাকা। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগিয়েছে, রেলের সম্পত্তি ভাঙচুর করেছে এবং রাস্তা অবরোধ করেছে। নিউ ফরাক্কা-আজিমগঞ্জ রেলসেকশনে প্রায় ছয় ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্ট জানিয়েছে, আদালত এই পরিস্থিতিতে নীরব থাকতে পারে না। নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আদালত কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারকেই আগামী ১৭ এপ্রিলের মধ্যে এই ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।